প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০১ জুন ২০২৬
ট্রাম্পের হুমকির তালিকায় বিশ্বের প্রতি ১৩ দেশের একটি
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণার সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত জোরেশোরে নিজেকে একজন যুদ্ধবিরোধী শান্তিকামী নেতা হিসেবে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করেছিলেন। সে সময় তিনি তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের তীব্র সমালোচনা করে অভিযোগ তুলেছিলেন যে, তারা ক্ষমতায় গেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অপ্রয়োজনীয় এবং রক্তক্ষয়ী সব বিদেশি যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলবে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, ক্ষমতায় বসার পর ট্রাম্পের সেই শান্তিবাদী রূপ যেন কর্পূরের মতো উড়ে যায়। তিনি নিজেই একের পর এক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রকে প্রকাশ্য সামরিক হামলার হুমকি দিতে শুরু করেন এবং বেশ কয়েকটি দেশে সরাসরি মার্কিন ফাইটার জেট ও ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে হামলাও পরিচালনা করেন। প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর একটি সাম্প্রতিক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। বিশ্বমঞ্চের প্রায় দুইশত দেশের মধ্যে অন্তত পনেরোটি দেশকে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দুই মেয়াদের শাসনকালে হয় সরাসরি ধ্বংসের হুমকি দিয়েছেন, না হয় সেখানে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছেন। গাণিতিক হিসাবে বলা যায়, বিশ্বের প্রতি তেরোটি দেশের মধ্যে অন্তত একটি দেশ ট্রাম্পের এই আগ্রাসী সামরিক হুমকি কিংবা প্রত্যক্ষ হামলার তালিকায় স্থান পেয়েছে।একেবারে সাম্প্রতিক একটি ঘটনার উদাহরণ টেনে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওমান যদি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করে, তবে দেশটিতে ভয়াবহ মার্কিন হামলা চালানো হবে বলে হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক রুদ্ধদ্বার বা রুটিন বৈঠকে তিনি অত্যন্ত খামখেয়ালিভাবে মন্তব্য করেন যে, ওমান যদি অন্য সভ্য দেশগুলোর মতো আচরণ না করে, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে বাধ্য হবে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ধরনের একটি ভয়ঙ্কর ও সংবেদনশীল হুমকি তিনি অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, প্রায় খেলাচ্ছলে উচ্চারণ করে ফেলেন, যা বিশ্বজুড়ে নতুন করে তুমুল বিতর্ক ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দুই দফার রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে থাকাকালীন যে পনেরোটি দেশকে টার্গেট করেছিলেন, তার সিংহভাগ ঘটনাই ঘটেছে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম ষোলো মাসের মধ্যে। তবে ইরান ও সিরিয়ার মতো কিছু দুর্ভাগা দেশ প্রথম ও দ্বিতীয় উভয় মেয়াদেই তাঁর স্থায়ী হুমকি এবং সামরিক আগ্রাসনের তালিকায় শীর্ষস্থানে ছিল।প্রাপ্ত তথ্য ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে বিশ্বের সাতটি স্বাধীন রাষ্ট্রে প্রত্যক্ষভাবে সামরিক অভিযান ও বোমাবর্ষণ সম্পন্ন করেছে। এই তালিকায় রয়েছে ইরান, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া এবং ভেনিজুয়েলা। এর বাইরেও আরও একঝাঁক প্রতিবেশ ও দূরবর্তী দেশের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য মার্কিন হামলার ব্লুপ্রিন্ট তৈরি রাখা হয়েছে, যার মধ্যে কানাডা, মেক্সিকো, কিউবা, পানামা, কলম্বিয়া, ওমান এবং ডেনমার্কের অধীনস্থ গ্রিনল্যান্ডও রয়েছে। শুধু তাই নয়, গত সেপ্টেম্বর মাস থেকে ক্যারিবীয় সাগর এবং পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মাদকবাহী সন্দেহে বিভিন্ন নৌকার ওপর মার্কিন নৌবাহিনী নির্বিচারে আক্রমণ চালিয়ে আসছে, যেখানে এ পর্যন্ত বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। ওয়াশিংটনের দাবি, লাতিন আমেরিকার শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেটগুলো যারা যুক্তরাষ্ট্রে বিষাক্ত মাদক সরবরাহ করছে, তাদের সমূলে বিনাশ করতেই এই বিশেষ সামরিক তৎপরতা। আর এই অঘোষিত অভিযানে নিহতের মোট সংখ্যা ইতিমধ্যেই দুইশত পাঁচ ছাড়িয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই ধরনের যুদ্ধংদেহী নীতি মূলত একপ্রকার অপ্রত্যাশিত মানসিক চাপ সৃষ্টির কৌশল, যাতে যেকোনো প্রতিপক্ষ দেশকে আলোচনার টেবিলে এনে নিজেদের শর্ত মানতে বাধ্য করা যায়। তবে সমালোচকরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, বিশ্বনেতার এই ধরনের কাণ্ডজ্ঞানহীন উসকানি ও একতরফা সামরিক পদক্ষেপ পুরো আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিকে এক চরম অস্থিতিশীল ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।একটি সাধারণ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলেই ট্রাম্পের এই আগ্রাসনের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ডোনাল্ড ট্রাম্প যেসব দেশকে ধ্বংসের ভয় দেখিয়েছেন বা আক্রমণ করেছেন, সেসব ভূখণ্ডে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় এগারো ভাগের এক ভাগ মানুষ অত্যন্ত আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করেন। অর্থাৎ, আজ পৃথিবীর প্রতি এগারো জন মানুষের মধ্যে একজন এমন এক দেশে জীবন কাটাচ্ছেন, যা কোনো না কোনো সময় মার্কিন মিসাইল বা বোমার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষের মনে এখন প্রতিনিয়ত এক অজানা মার্কিন আগ্রাসনের চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে বিশটিরও কম দেশের মধ্যে অন্তত পাঁচটি দেশ ট্রাম্পের সরাসরি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল, যা এই অঞ্চলের মোট দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। শুধু কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নয়, ট্রাম্পের এই সামরিক আধিপত্যবাদের কালো ছায়া ছড়িয়ে পড়েছে এশিয়া, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার মতো চারটি বিশাল মহাদেশে। এমনকি ইউরোপ মহাদেশের শান্তিপূর্ণ দেশ ডেনমার্ককেও তিনি পরোক্ষভাবে হুমকির মুখে ফেলেছেন, যখন তিনি ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত বরফাচ্ছন্ন অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডকে জোরপূর্বক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রকাশ্য ইচ্ছা ও খায়েশ ব্যক্ত করেছিলেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ট্রাম্পের তালিকায় থাকা পনেরোটি দেশের মধ্যে পাঁচটিকে তিনি সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী অংশ বা উপনিবেশ বানানোর সুপ্ত বাসনার কথা উল্লেখ করেছেন। এই তালিকায় থাকা কানাডা, কিউবা, গ্রিনল্যান্ড, পানামা খাল অঞ্চল এবং ভেনিজুয়েলার মতো দেশগুলোর ওপর মার্কিন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার এই প্রস্তাব ও মানসিকতা ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিকে বিশ্ববাসীর কাছে চরম আগ্রাসী, সাম্রাজ্যবাদী ও সম্প্রসারণবাদী হিসেবে নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে।মূল উৎস: সিএনএন
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল