প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০১ জুন ২০২৬
ভিয়েতনাম যুদ্ধকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে ইরান সংকটের ভূরাজনৈতিক প্রভাব
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিচালিত সংক্ষিপ্ত মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বা তথাকথিত ‘ছোট অভিযান’ সমকালীন জটিল ও পারস্পরিক আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে মার্কিন সামরিক শক্তির অন্তর্নিহিত কৌশলগত দুর্বলতাকেই অত্যন্ত দ্রুত ও নগ্নভাবে প্রকাশ করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংক্ষিপ্ত সংঘাতের সুদূরপ্রসারী ফলাফল এতটাই মারাত্মক যে, এটি বিশ্ব ইতিহাসে বিখ্যাত ভিয়েতনাম যুদ্ধের চেয়েও আরও বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের মোড় হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। অতীতে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ১৯৬৫ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধকে রাজনৈতিকভাবে যৌক্তিকতা দেওয়ার জন্য তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন জোর দিয়ে বলেছিলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থেই বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, একের পর এক মার্কিন প্রেসিডেন্টরা তাদের আকাশচুম্বী সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের অহংকারে বুঁদ হয়ে বিভিন্ন দেশে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন এবং পরবর্তীতে চরম বিপর্যয় ও অপমানের মুখে পড়েছেন। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রে ধারণা করা হয়েছিল যে, তার উগ্র সমর্থকদের যুদ্ধবিরোধী মনোভাবের কারণে তিনি হয়তো এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত নেবেন না। কিন্তু বর্তমান শান্তি চুক্তির খসড়া ও রূপরেখা বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ট্রাম্পের এই ইরান অভিযানকে এখন বিশ্বব্যাপী সার্বজনীনভাবে একটি বড় ধরনের ‘পরাজয়’ হিসেবেই গণ্য করা হচ্ছে।আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম কালো অধ্যায় ভিয়েতনাম যুদ্ধের তুলনায় আকার বা ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে এই সংঘাত হয়তো অনেক ছোট এবং এতে মাত্র তেরো জন মার্কিন সেনার লাশ স্বদেশে ফিরে এসেছে। তবে এর বৈশ্বিক ও আন্তর্জাতিক ফলাফলের গভীরতা বিচার করলে দেখা যাবে, এটি অত্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব রেখে যাচ্ছে। ১৯৭৫ সালে সাইগনের পতনের পর তৎকালীন মার্কিন নীতিনির্ধারকরা এশিয়াজুড়ে কমিউনিজমের যে ‘ডমিনো ইফেক্ট’ বা একের পর এক রাষ্ট্রের পতনের আশঙ্কা করেছিলেন, বাস্তবে তা ঘটেনি। তবে ট্রাম্পের এই সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধ ইতোমধ্যে বিশ্বরাজনীতির বেশ কয়েকটি প্রধান ক্ষেত্রে আমূল ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রথমত, এই যুদ্ধ ইসরাইলের দীর্ঘ ২০ বছরের লালিত ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’ কৌশলের এক চরম পতন ডেকে এনেছে। ইসরাইলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা ড্যানি সিট্রিনোভিচ সামগ্রিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে একে ইসরাইলের জন্য একটি ‘অপারেশনাল সাফল্য কিন্তু কৌশলগত বিপর্যয়’ হিসেবে নিখুঁতভাবে বর্ণনা করেছেন। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলো এখন নতুন করে আত্মোপলব্ধি করতে শুরু করেছে। নিজেদের মাটিতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি আদতে তাদের কোনো দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কি-না, তা নিয়ে উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো এখন তাদের সামগ্রিক ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক ও মেরুকরণ পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য হচ্ছে। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান শাপিরো বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সৌদি আরব বা কাতারের মতো প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দীর্ঘদিনের মার্কিন দাবিকে সম্পূর্ণ ‘অলীক’ এবং অবাস্তব বলে স্পষ্ট আখ্যা দিয়েছেন।আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের সমীকরণ যে সম্পূর্ণ বদলে গেছে, এই সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ তা আরও একবার অকাট্যভাবে প্রমাণ করল। যুদ্ধক্ষেত্রে অত্যন্ত সস্তা ও সহজে উৎপাদনযোগ্য আধুনিক ড্রোন যে যেকোনো বড় শক্তির বিরুদ্ধে এক বিশাল ও কার্যকর সমতাবিধানকারী শক্তি হতে পারে, তা এখন প্রমাণিত। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ অভিযানের শুরুতে আকাশপথ থেকে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও চরম আঘাতের বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিলেও, তা শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের জন্য কোনো রাজনৈতিক বা সামরিক বিজয় বয়ে আনতে পারেনি। উল্টো এই যুদ্ধ মার্কিন সামরিক বাহিনীর অত্যন্ত ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্রের বড় মজুদ এবং জরুরি প্রতিরক্ষা তহবিলকে পুরোপুরি খালি করে দিয়েছে। এর পাশাপাশি, এই যুদ্ধের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধাক্কা ইউরোপ মহাদেশের ওপর এসে পড়েছে অত্যন্ত তীব্রভাবে। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে ইউরোপের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান ও ব্যয় মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের মতো ক্ষমতাধর দেশগুলোর ক্ষমতাসীন মধ্যপন্থি দলগুলো আগামী নির্বাচনগুলোতে বড় ধরনের ভরাডুবির মুখে পড়তে যাচ্ছে। এর ওপর আবার ট্রাম্পের পক্ষ থেকে উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট বা ন্যাটো থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের অব্যাহত হুমকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের দীর্ঘদিনের ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামোকে ভেতর থেকে একেবারে দুর্বল ও নড়বড়ে করে দিচ্ছে।কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের বিশিষ্ট গবেষক রেবেকা লিসনার এ বিষয়ে তীব্র সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে বলেছেন, এই যুদ্ধ ইতোমধ্যে লাইফ সাপোর্টে থাকা মার্কিন নেতৃত্বাধীন তথাকথিত আন্তর্জাতিক বিশ্ব ব্যবস্থার ওপর এক মারাত্মক ও মরণোত্তর আঘাত হেনেছে। ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত মিত্ররা এখন তাদের নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে আমেরিকার বাইরে নতুন কোনো আন্তর্জাতিক ক্ষমতার কেন্দ্রের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে। সাবেক মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট কর্মকর্তা মীরা র্যাপ-হুপার এই পরিস্থিতিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘পরাক্ষতির আত্মহত্যা’ বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, যুদ্ধ ইরানকে সামাজিকভাবে কিছুটা দুর্বল ও ক্ষতিগ্রস্ত করলেও, দেশটির দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের ভেতরের জাতীয়তাবাদী প্রতিরোধ ক্ষমতাকে নতুন করে পুনরুজ্জীবিত করে তুলেছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশিষ্ট বিশ্লেষক আলী ভায়েজ বলেন, এই যুদ্ধ ইরানকে মূলত তিনটি বড় উপহার দিয়েছে— আদর্শিক পুনরুজ্জীবিতকরণ, বৈদেশিক সামরিক হস্তক্ষেপের প্রতি অভ্যন্তরীণ চরম অগ্রহণযোগ্যতা এবং তাদের সামগ্রিক প্রতিরোধ কৌশলের আধুনিক সংস্কার। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নিজেদের ভৌগোলিক অবস্থান ও বিশ্বায়নের সুবিধাকে ইরান এখন নিজের সবচেয়ে বড় সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করতে শিখে গেছে।সিএফআর-এর সাবেক প্রধান গিডন রোজের মতে, ট্রাম্পের যুদ্ধনীতিতে ভিয়েতনামের ছায়া স্পষ্ট। ট্রাম্প প্রথমে লিন্ডন জনসনের মতো হুট করে যুদ্ধে প্রবেশ ও সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধি করেন এবং পরবর্তীতে রিচার্ড নিক্সন ও হেনরি কিসিঞ্জারের বিখ্যাত ‘উন্মাদ তত্ত্ব’ বা নিজের চরম অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের হুমকি প্রদর্শনের কৌশল ব্যবহার করে একটি অত্যন্ত অসন্তোষজনক ও দুর্বল চুক্তির দিকে এগিয়ে যান। কিসিঞ্জার যেমন একদা ভিয়েতনামকে একটি চতুর্থ সারির দুর্বল শক্তি মনে করে ভুল করেছিলেন, ট্রাম্পও ঠিক তেমনি ভেবেছিলেন যে কয়েক দিনের তীব্র বিমান হামলাতেই হয়তো ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটবে। ট্রাম্প অহংকার করে দাবি করেছিলেন যে, ২০২৫ সালের জুনের এই সংক্ষিপ্ত ও বিধ্বংসী যুদ্ধের মাধ্যমে তিনি ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে সম্পূর্ণরূপে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন। তবে সাবেক ইউরোপীয় ইউনিয়ন আলোচক ফেডেরিকা মোগেরিনি ট্রাম্পের এই দাবিকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়ে এই যুদ্ধটিকে শুরু থেকেই ‘অবৈধ, অযৌক্তিক ও বেপরোয়া’ বলে তীব্র সমালোচনা করেছেন।এদিকে হোয়াইট হাউসের শীর্ষ কর্মকর্তারা আড়ালে স্বীকার করেছেন যে, ইরান আক্রমণে ট্রাম্পকে প্ররোচিত করার পেছনে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর একটি বড় প্ররোচনামূলক ভূমিকা ছিল। যদিও পরবর্তীতে একটি সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু নিজেই স্বীকার করেন যে, যুদ্ধ যত সামনের দিকে গড়িয়েছে, হরমুজ প্রণালির বন্ধ হয়ে যাওয়ার আসল ভয়াবহতা তারা তত বেশি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান ফাতিহ বিরল এই সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে একটি ‘কেয়ামতের মতো পরিস্থিতি’ হিসেবে উল্লেখ করলেও মার্কিন প্রতিরক্ষা সদরদপ্তর পেন্টাগন কোনোভাবেই ইরানের ‘ত্রিমুখী জবরদস্তিমূলক’ যুদ্ধকৌশল আগে থেকে অনুমান করতে পারেনি, যা মূলত উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মূল অবকাঠামোতে সরাসরি আঘাত হেনেছিল। বর্তমানে এই সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোট আর্থিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল অঙ্কে। শেষ পর্যন্ত সৌদি আরব, তুরস্ক, কাতার, মিশর এবং পাকিস্তানের মতো আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর একটি শক্তিশালী ও নজিরবিহীন জোট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পুনরায় এই মারাত্মক আত্মঘাতী সংঘাত সচল করা থেকে বিরত রাখতে বাধ্য করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এখন আর ওয়াশিংটনের ওপর অন্ধভাবে নির্ভর না করে, ইরানের সাথে এই আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কই মূলত আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্যের আসল ভবিষ্যৎ ও ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণ করবে।উৎস: দ্য গার্ডিয়ান
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল