প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩০ মে ২০২৬
সৈকতজুড়ে ঝুঁকি, কুয়াকাটায় ভয় বাড়াচ্ছে কংক্রিটের ফাঁদ
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
পটুয়াখালীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি ও সাগরকন্যা হিসেবে পরিচিত কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত এখন পর্যটকদের জন্য এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে সৈকতের জিরো পয়েন্ট ও তার আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য কংক্রিটের ফাঁদ। জোয়ারের সময় যখন চারদিক পানিতে ভেসে যায়, তখন এই মরণফাঁদগুলো পর্যটকদের জন্য চরম বিপদের কারণ হয়ে দেখা দেয়। আনন্দের খোঁজে সমুদ্রের নীল জলে ভাসতে গিয়ে অনেকেই মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন।স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে জানা যায়, দীর্ঘ সময় ধরে এই এলাকায় একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটে চললেও বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি কিংবা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর বা দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। এমনকি কোন এলাকাগুলো বেশি বিপজ্জনক, তা সাধারণ মানুষকে বোঝানোর জন্য একটি সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড বা লাল নিশানেরও ব্যবস্থা করা হয়নি। সৈকতের পাশেই ট্যুরিস্ট পুলিশের বক্স থাকলেও তাদের তরফ থেকেও কোনো নজরদারি বা সতর্কতা জারি করার উদ্যোগ চোখ পড়ে না।অনুসন্ধানে জানা যায়, এই বিপজ্জনক পরিস্থিতির সূত্রপাত মূলত আজ থেকে বেশ কয়েক বছর আগে। ২০০৭ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডর এবং ২০০৯ সালের আইলার আঘাতে সৈকতসংলগ্ন এলজিইডির একটি বাংলো পুরোপুরি ধসে পড়ে। পরবর্তী সময়ে মূল ভবনটি ওপর থেকে সরিয়ে নেওয়া হলেও মাটির নিচে রয়ে যায় ভবনের শক্ত গাইডওয়াল, বিশাল পিলার এবং অন্যান্য কংক্রিটের কাঠামো। শুধু তাই নয়, গত কয়েক বছরে সমুদ্রের গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া গণশৌচাগার, জাতীয় উদ্যানের প্রধান ফটক, ওয়াচ টাওয়ার, বসার চেয়ার-বেঞ্চ এবং সীমানা প্রাচীরের মতো অসংখ্য স্থাপনার ভাঙা অংশ সৈকতের যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। জোয়ারের সময় এই সবকিছু বালু ও পানির নিচে সম্পূর্ণ ঢাকা পড়ে যায়।প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার পর্যটক কুয়াকাটায় আসেন এবং জিরো পয়েন্ট এলাকায় সমুদ্রে গোসলে নামেন। জোয়ারের উত্তাল ঢেউয়ের সাথে মেতে ওঠার মুহূর্তে তারা কল্পনাও করতে পারেন না যে পায়ের নিচেই লুকিয়ে আছে ধারালো কংক্রিটের টুকরো ও জংধরা লোহার রড। ফলে বুকভরা আনন্দ নিয়ে পানিতে নেমে অনেকেই রক্তাক্ত শরীরে ফিরে আসছেন। এই অসতর্কতার মূল্য দিতে গিয়ে প্রায় দেড় বছর আগে মাগুরার হাজিপুর পশ্চিম বাড়িয়াল এলাকার বাসিন্দা মিয়া সামাদ সিদ্দিকী ওরফে পারভেজ নামের এক সতেরো বছরের কিশোর কংক্রিটের আঘাতে অচেতন হয়ে স্রোতের টানে ভেসে গিয়ে প্রাণ হারায়।সৈকতে ঘুরতে আসা পর্যটকেরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, এমন একটি আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্রে নিরাপত্তার এই বেহাল দশা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। যেকোনো বড় দুর্ঘটনা এড়াতে এখনই এসব ধ্বংসাবশেষ দ্রুত অপসারণ করা দরকার। অন্যদিকে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, শুধু কংক্রিটই নয়, সৈকতে থাকা শ্যাওলাধরা জিওটিউবগুলোতে পা পিছলে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আহত হচ্ছেন। জোয়ারের সময় পানির নিচে ধারালো রড বা কংক্রিটে পা কেটে যাওয়া কিংবা পায়ের নখ উপড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা এখানে নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।এই চরম অব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকির বিষয়ে কুয়াকাটা পৌর প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেক আশ্বাস দিয়ে জানিয়েছেন, পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছেন। খুব দ্রুতই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে সেখানে সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড স্থাপন করা হবে এবং পর্যটকদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে সাধারণ মানুষ ও পর্যটকদের দাবি, শুধু মুখের আশ্বাস বা সাইনবোর্ড নয়, বরং সমুদ্রের তলদেশে লুকিয়ে থাকা এই মৃত্যুর ফাঁদগুলোকে চিরতরে অপসারণ করে কুয়াকাটাকে আবার নিরাপদ করে তোলা হোক।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল