প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩০ মে ২০২৬
ট্রাম্পের ১৭৭ কোটি ৬০ লাখ ডলারের তহবিল আটকে গেল
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত ১৭৭ কোটি ৬০ লাখ ডলারের (১.৭৭৬ বিলিয়ন ডলার) একটি বিশাল আর্থিক তহবিল গঠনের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন দেশটির একটি ফেডারেল আদালত। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই তহবিলটিকে মূলত সরকারের ‘অস্ত্রায়ন’ তথা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার একটি বিশেষ উদ্যোগ হিসেবে দাবি করা হয়েছিল। তবে আদালতের এই সাম্প্রতিক আদেশের ফলে বহুল আলোচিত এই ‘অ্যান্টি-ওয়েপনাইজেশন’ বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার বিরোধী সমঝোতা তহবিলটির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম এবং এর আওতায় যেকোনো ধরনের অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া আগামী অন্তত দুই সপ্তাহের জন্য পুরোপুরি থমকে গেল।আমেরিকার ভার্জিনিয়ার আলেকজান্দ্রিয়ার ইউএস ডিস্ট্রিক্ট বিচারক লিওনি ব্রিঙ্কেমা এই স্থগিতাদেশের রায় ঘোষণা করেন। একই সাথে এই তহবিলের আইনি বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা মামলার প্রেক্ষিতে স্থগিতাদেশের মেয়াদ আরও বাড়ানো হবে কি-না, সেই বিষয়ে বিস্তারিত যুক্তিতর্কের জন্য আগামী ১২ জুন পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন আদালত। বিচারক তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছেন যে, চলমান আইনি প্রক্রিয়ার স্বার্থে অন্তত আগামী দুই সপ্তাহ বর্তমান স্থিতি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি, যাতে এই তহবিল থেকে কোনো অর্থ এমনভাবে বিতরণ না হয়ে যায় যা পরবর্তীতে আর ফেরত আনা সম্ভব হবে না। আদালতের এই স্পষ্ট নির্দেশনার ফলে ট্রাম্প প্রশাসন এখন চাইলেও এই তহবিলে নতুন করে কোনো অর্থ স্থানান্তর করতে পারবে না, কোনো আবেদন বা দাবি বিবেচনা করতে পারবে না এবং তহবিল থেকে আপাতত কাউকে কোনো অর্থ বিতরণও করতে পারবে না।এই বিশেষ তহবিলটি গঠনের পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত কর বিবরণী ফাঁসের ঘটনায় ইন্টারনাল রেভিনিউ সার্ভিস বা আইআরএস-এর বিরুদ্ধে করা ট্রাম্পের একটি মামলার নিষ্পত্তির অংশ হিসেবে এই তহবিলটি তৈরি করেছিল বর্তমান প্রশাসন। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার রাজনৈতিক মিত্ররা, যারা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সরকারের’ বা রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসার শিকার বলে দাবি করে আসছেন, তাদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যেই মূলত এটি সাজানো হয়। তবে প্রকাশের পর থেকেই এই তহবিলটি নিয়ে খোদ মার্কিন রাজনীতি ও প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।বিতর্কের আঁচ এতটাই তীব্র যে, খোদ ট্রাম্পের নিজস্ব দল রিপাবলিকান পার্টির অনেক নেতাই এই তহবিলের যোগ্যতার মাপকাঠি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চের কাছে এই তহবিলের অর্থ বরাদ্দের নীতিমালা ও স্বচ্ছতা নিয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছেন। বিশেষ করে, ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ওয়াশিংটনের ইউএস ক্যাপিটল হিলে যে ভয়াবহ দাঙ্গা ও হামলার ঘটনা ঘটেছিল, সেই দাঙ্গায় অভিযুক্ত বা সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও এই তহবিল থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আবেদন করতে পারবে কি-না, তা নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের শুনানিতে ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেলও এমন আশঙ্কার কথা বা সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দিতে পারেননি, যা সাধারণ মানুষের মনে সংশয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।এই তহবিলটির আইনি বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ‘ডেমোক্রেসি ফরওয়ার্ড’ নামের একটি প্রভাবশালী আইনি অধিকার রক্ষা বিষয়ক সংস্থা আদালতের দ্বারস্থ হয়। তাদের আইনজীবীরা এই তহবিলের সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন ও অর্থ বিতরণ প্রক্রিয়া স্থায়ীভাবে বন্ধের দাবিতে মামলাটি দায়ের করেন। তাদের মূল অভিযোগ হলো, এই ধরনের একটি বিশাল তহবিল গঠনের পেছনে কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি, সাংবিধানিক অনুমোদন বা জবাবদিহিতার বালাই নেই। এই মামলার বাদীদের তালিকায় রয়েছেন চাকরিচ্যুত একজন সরকারি প্রসিকিউটর এবং বিক্ষোভে অংশ নিয়ে ফেডারেল এজেন্টদের ওপর হামলার অভিযোগ থেকে সসম্মানে খালাস পাওয়া একজন কলেজ অধ্যাপক।এছাড়াও এই বিতর্কিত তহবিলের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের অন্যান্য আদালতেও আরও দুটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলা করেছে ‘সিটিজেন্স ফর রেসপন্সিবিলিটি অ্যান্ড এথিক্স ইন ওয়াশিংটন’ নামের একটি অলাভজনক সংস্থা। তারা এই পুরো উদ্যোগটিকে ‘প্রেসিডেন্সিয়াল দুর্নীতির একটি চোখ কপালে তোলার মতো নজিরবিহীন ঘটনা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। অন্য মামলাটি দায়ের করেছেন ক্যাপিটল হিলের সেই ভয়াবহ দাঙ্গা ঠেকাতে গিয়ে আহত ও কর্তব্যরত অবস্থায় থাকা দুজন নির্ভীক পুলিশ কর্মকর্তা।আইনি এই লড়াই কেবল ওয়াশিংটন বা ভার্জিনিয়াতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং পেনসিলভানিয়া এবং ফ্লোরিডার ফেডারেল আদালতও ট্রাম্পের আইনজীবীদের এই তহবিল সংক্রান্ত বিভিন্ন আইনি মারপ্যাঁচ এবং তহবিল গঠনের পেছনে লুকিয়ে থাকা ‘প্রতারণার’ সুনির্দিষ্ট অভিযোগের জবাব আগামী ১২ জুনের মধ্যে লিখিতভাবে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এতসব সমালোচনা ও আইনি জটিলতার পরও মার্কিন বিচার বিভাগ অবশ্য দাবি করেছে যে, তারা এই তহবিলের আইনি বৈধতার ব্যাপারে পুরোপুরি আত্মবিশ্বাসী এবং অতীতের কিছু আইনি নজির ও দৃষ্টান্তের আলোকেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানাতে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে। তবে স্বস্তির বিষয় এই যে, আদালতের এই স্থগিতাদেশ আসার আগে পর্যন্ত এই বিতর্কিত তহবিল থেকে এখনো কোনো অর্থ কাউকে বিতরণ করা হয়নি এবং ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক দাবি বা আবেদনও গ্রহণ করা শুরু হয়নি। ফলে আগামী ১২ জুনের শুনানির ওপরই এখন নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের এই বিপুল অর্থের ভবিষ্যৎ।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল