প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩০ মে ২০২৬
আইএমএফ- বিশ্বব্যাংকের শঙ্কা: তীব্রতর হতে পারে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
বিশ্ব অর্থনীতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি খাতের ওপর আসন্ন এক বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কায় পুরো বিশ্বকে একযোগে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা। গত শুক্রবার এই তিন শীর্ষ আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানরা অত্যন্ত উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন যে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে না আসে, তবে চলতি গ্রীষ্ম মৌসুমেই বিশ্বজুড়ে এক ভয়াবহ ও তীব্র জ্বালানি সংকট তৈরি হতে পারে।তিনটি প্রভাবশালী সংস্থার প্রধানদের স্বাক্ষরিত এক বিশেষ যৌথ বিবৃতিতে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তেলের জরুরি ও আপৎকালীন যে মজুত রয়েছে, তা ইতিহাসের রেকর্ড গতিতে প্রতিনিয়ত কমছে। তাঁরা আরও সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, আন্তর্জাতিক এই নৌপথে জাহাজ চলাচল যদি অবিলম্বে স্বাভাবিক করা সম্ভব না হয়, তবে উত্তর গোলার্ধের দেশগুলোতে গ্রীষ্মকালীন জ্বালানির চাহিদা সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানোর আগেই বিশ্বের মোট তেলের মজুত সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে তা কেবল বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তাকেই হুমকিতে ফেলবে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি এবং সামগ্রিক বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ক্রমান্বয়ে এক অনিয়ন্ত্রণযোগ্য ও মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে।মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সামরিক সংঘাত সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলকে এক অভূতপূর্ব ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সামরিক পদক্ষেপের পাল্টা জবাব হিসেবে ইরান এই অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্র দেশগুলোর বিভিন্ন কৌশলগত স্থাপনার ওপর উপর্যুপরি হামলা চালাচ্ছে এবং এর অংশ হিসেবে তারা বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রধান ধমনী তথা হরমুজ প্রণালী কার্যত অবরুদ্ধ ও বন্ধ করে দিয়েছে। উল্লেখ্য, বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন যে পরিমাণ জ্বালানি ও খনিজ তেল পরিবাহিত হয়, তার মোট পাঁচ ভাগের এক ভাগই এই অতি সংবেদনশীল নৌপথ দিয়ে যাতায়াত করে। ফলে এই পথটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ চেইন।এই গভীর সংকট মোকাবিলায় পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে গত এপ্রিল মাসেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধানরা একটি বিশেষ উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স বা দল গঠন করার কথা জানিয়েছিলেন। এই বিশেষ দলটির মূল কাজ হলো চলমান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোর সংকট মোকাবিলায় সমন্বিতভাবে বিভিন্ন পলিসি ও আর্থিক সহায়তা নিয়ে একসঙ্গে কাজ করা। শুক্রবারের যৌথ বিবৃতিতে সংস্থাগুলোর প্রধানরা আবারও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই প্রলম্বিত যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল এবং কৃষি খাতের প্রধান উপাদান সার—উভয়েরই দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ ও মুদ্রাস্ফীতির চড়া মূল্য সবচেয়ে বেশি দিতে হচ্ছে বিশ্বের নিম্ন আয়ের ও অনুন্নত দেশগুলোকে। বিশেষ করে বিশ্ববাজারে সারের আকাশচুম্বী দাম বৃদ্ধি পাওয়াকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন তাঁরা। কারণ বর্তমান সময়ে বিশ্বের অনেক কৃষিপ্রধান দেশেই আমন বা প্রধান প্রধান শস্য চাষাবাদের মূল মৌসুম শুরু হচ্ছে, যা সারের অভাবে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।এর আগে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বসন্তকালীন বৈঠকে সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা অত্যন্ত হতাশার সাথে জানিয়েছিলেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া এই যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতির সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অনেকটাই কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে তাঁর সংস্থা। তিনি সেই সময়ে আরও উল্লেখ করেছিলেন যে, উদ্ভূত সংকট কাটিয়ে উঠতে বিশ্বের দুর্বল ও ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে অন্তত দুই হাজার থেকে পাঁচ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের বিশাল অংকের বিশেষ আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি সপ্তাহে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, উদ্ভূত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে বাংলাদেশও সংস্থাটির কাছে একটি বিশেষ আর্থিক সহায়তা প্যাকেজের আবেদন করেছে। ঢাকাকে এই সংকটকালীন সময়ে সাহায্য করতে এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে একটি কার্যকর কর্মসূচি ও ঋণ সহায়তা তৈরির বিষয়ে বর্তমানে দুই পক্ষের মধ্যে নিবিড় আলোচনা ও পর্যালোচনা চলছে।মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ এখন আর কোনো আঞ্চলিক সংকট নয়, বরং তা বিশ্বজুড়ে বহুমুখী ও সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে যেসব দেশ নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদার সিংহভাগ মেটাতে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল, তারা এখন সবচেয়ে বেশি ও প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশিরভাগ উদীয়মান অর্থনীতির দেশই মূলত এই আমদানির তালিকায় পড়ে, যার মধ্যে বাংলাদেশ ও তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো অন্যতম। জ্বালানির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে সারের তীব্র সরবরাহ সংকটের কারণে আমদানিনির্ভর দেশগুলো এক চরম ও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার এই আশঙ্কা থেকে বিশ্বজুড়ে এখন দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তা নিয়েও এক বড় ধরনের বৈশ্বিক উদ্বেগ ও ভীতি তৈরি হয়েছে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল