প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৯ মে ২০২৬
ন্যায্যমূল্য না পেয়ে অবিক্রীত চামড়ায় হতাশ মৌসুমী ব্যবসায়ীরা
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
রংপুরের তারাগঞ্জে এবার কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে এক নজিরবিহীন বিপর্যয় ও চরম মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত ঈদুল আজহার পর যেখানে চামড়া বাজার জমজমাট থাকার কথা, সেখানে সম্পূর্ণ উল্টো এক চিত্র ফুটে উঠেছে এই এলাকায়। ন্যায্যমূল্যের চরম অভাব এবং পাইকারি ক্রেতা বা আড়তদারদের সংকটে উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কুর্শা বাজারের রাস্তার পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে হাজার হাজার অবিক্রীত চামড়া। বাজারে কোনো ক্রেতা না থাকায় পুরো চামড়া পট্টি জুড়ে এক ধরনের স্থবিরতা ও নীরবতা নেমে এসেছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী, খামারি এবং সাধারণ মানুষ, যারা বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন।এক সময় ঈদের মৌসুমে তারাগঞ্জের যে চামড়া পট্টি ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে মুখরিত থাকত, সেখানে এখন কেবলই হাহাকার। ন্যায্য দাম তো দূরের কথা, চামড়া কেনার মতো কোনো মানুষই বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। উপায় না পেয়ে অনেক বিক্রেতা এবং মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়া অবিক্রীত অবস্থায় বাড়ি, আড়ত, বিভিন্ন মসজিদ প্রাঙ্গণ এমনকি খোলা জায়গায় ফেলে রেখে চলে গেছেন। এর ফলে এলাকার বিভিন্ন স্থানে চামড়ার বড় বড় স্তূপ তৈরি হয়েছে। প্রচণ্ড গরমে এই চামড়াগুলো পচে চারদিকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, যা স্থানীয়ভাবে মারাত্মক পরিবেশ দূষণ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।স্থানীয় খুচরা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাজারে পশুর চামড়ার দাম এতটাই কমে গেছে যা কল্পনারও বাইরে। বর্তমানে বেশ ভালো মানের ও বড় আকারের একটি গরুর চামড়া মাত্র ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে, কিছুটা নিম্নমানের কিংবা সামান্য ত্রুটিযুক্ত ও ফাটা-ছেঁড়া চামড়াগুলো ১০০ থেকে ১৫০ টাকার বেশি দামে কেউ ছুঁয়েও দেখছে না। গত বছরের তুলনায় এবার চামড়ার দাম এতটাই নাটকীয়ভাবে কমে গেছে যে, সাধারণ বিক্রেতাদের চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের খরচও উঠছে না। ফলে বাজারে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মধ্যে এক বিশাল অমিল ও ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে।তারাগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের বিভিন্ন হাট-বাজার এবং প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে এক করুণ দৃশ্য। বাজারে চামড়ার কোনো চাহিদা না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে চামড়া বিক্রি না করে নিজেদের বাড়ির আঙিনা, মসজিদের চত্বর কিংবা স্থানীয় দোকানের পাশে স্তূপ করে রেখে দিয়েছেন। উপযুক্ত দাম না পেয়ে অনেকে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলার কথাও ভাবছেন।দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবসার সাথে জড়িত স্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ী আব্দুল জলিল তাঁর ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে জানান, প্রতি বছরের মতো এবারও ভালো লাভের আশা নিয়ে তাঁরা গ্রামগঞ্জ থেকে চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু বাজারে এসে দেখেন চামড়ার কোনো চাহিদাই নেই। তাঁরা যে দামে চামড়া কিনেছেন, এখন ঠিক সেই দামেও কেউ চামড়া কিনতে চাইছে না। কেনা দামে বিক্রি করতে গেলেও যাতায়াত ও লবণ দেওয়ার খরচ মিলিয়ে তাঁদের বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে। এভাবে বাজারের ধস চলতে থাকলে ভবিষ্যতে এই ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।একই বাজারের আরেক অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, তাঁর দীর্ঘ ব্যবসায়ী জীবনে চামড়া বাজারের এমন শোচনীয় অবস্থা তিনি আগে কখনো দেখেননি। বাজারে কোনো বড় পাইকার বা ট্যানারি মালিকদের প্রতিনিধি নেই, চামড়ার কোনো দামও নেই। ধারদেনা করে চামড়া কিনে এখন তা গুদামে ফেলে রেখে শুধু অলস সময় পার করতে হচ্ছে। চামড়াগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে তাঁরা আরও বেশি আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সব মিলিয়ে তারাগঞ্জের চামড়া শিল্প এখন এক গভীর সংকটের মুখোমুখি, যা থেকে উত্তরণের কোনো পথ আপাতত চোখে পড়ছে না।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল