প্রিন্ট এর তারিখ : ২৬ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৬ মে ২০২৬
নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে কিছু আধুনিক অস্ত্র
তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক ||
আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম বিস্ময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং এর নেতিবাচক অপব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু পোপ লিও। সোমবার প্রকাশিত তাঁর জীবনের প্রথম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক এক নথিতে তিনি বিশ্বের সমস্ত দেশের সরকার ও নীতিনির্ধারকদের অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন। পোপ তীব্র আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভুল ব্যবহার এবং এর মাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা বা ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা সমগ্র বিশ্বকে এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, চরম বিশৃঙ্খলা ও ভয়াবহ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।ভ্যাটিকান সিটিতে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে বিশ্ববাসীর উদ্দেশে বক্তব্য রাখার সময় পোপ অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সময়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত কিছু কিছু স্বয়ংক্রিয় মারাত্মক অস্ত্রব্যবস্থা এখন পুরোপুরি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, যা মানবসভ্যতার জন্য এক বিরাট হুমকি। উল্লেখ্য, সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের ইরান যুদ্ধ নিয়ে কড়া সমালোচনা করার কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র বিরাগভাজন ও অসন্তোষের মুখে পড়েছিলেন পোপ লিও। তবে সেই সমস্ত সমালোচনা ও রাজনৈতিক চাপকে উপেক্ষা করেই এবার ‘এনসাইক্লিক্যাল’ নামে প্রকাশিত তাঁর এক দীর্ঘ ও ঐতিহাসিক নথিতে তিনি বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দূরদর্শী আহ্বান জানিয়েছেন।‘ম্যাগনিফিকা হিউম্যানিটাস’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রায় ৪৩ হাজার শব্দের এই বিশাল ও তাৎপর্যপূর্ণ নথিতে পোপ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংক্রান্ত যেকোনো ধরনের সংবেদনশীল তথ্য, ডেটা এবং সামগ্রিক প্রযুক্তির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কখনোই কেবল কয়েকটি বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। এই প্রযুক্তির আগ্রাসন থেকে সাধারণ শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও অধিকার রক্ষা করা এবং কোমলমতি শিশুদের মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্বের সব দেশের নীতিনির্ধারকদের অবিলম্বে সক্রিয় ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানান তিনি। একই সাথে এআই তৈরি করা বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মধ্যকার অসম ও অনৈতিক প্রতিযোগিতা কমিয়ে আনার ওপরও তিনি বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন।পোপ তাঁর নথিতে অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে লিখেছেন যে, বর্তমান বিশ্বে যখন সবকিছু একপ্রকার নিয়ন্ত্রণহীন ও লাগামহীনভাবে সামনের দিকে এগোচ্ছে, তখন এই ধ্বংসাত্মক প্রযুক্তির লাগাম টেনে ধরার জন্য বিশ্বনেতাদের মধ্যে অত্যন্ত জোরালো ও দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন। তিনি এই প্রযুক্তিকে নিয়মের মধ্যে বাঁধতে শক্তিশালী আইনি কাঠামো তৈরি এবং এর কার্যক্রমের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারির জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীন একটি তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন। এই ‘এনসাইক্লিক্যাল’ মূলত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ক্যাথলিক গির্জার প্রায় ১৪০ কোটি অনুসারীর জন্য পোপের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও সামাজিক দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হয়। পোপ হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর থেকেই অত্যন্ত যত্নসহকারে এই ঐতিহাসিক নথি তৈরির কাজ চলছিল।এই সুদীর্ঘ নথিতে পোপ শুধু প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়েই কথা বলেননি, বরং বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ সংস্কৃতির মূল শিকড় নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার বিশাল মুনাফাই মূলত বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের যুদ্ধ ও রক্তাক্ত সংঘাতগুলোকে কৃত্রিমভাবে টিকিয়ে রাখছে। তাঁর ভাষায়, বর্তমান মানবতা এখন এক চরম সহিংস ও অন্ধ ক্ষমতার সংস্কৃতির দিকে ধাবিত হচ্ছে, যেখানে বৈশ্বিক শান্তি এখন আর কোনো স্থায়ী দায়িত্ব বা অর্জন নয়, বরং তা কেবল দুটি বড় যুদ্ধের মাঝখানে একটি সাময়িক ও ভঙ্গুর বিরতিমাত্র।একই সাথে পোপ বহু বছর ধরে চলে আসা ‘জাস্ট ওয়ার’ বা তথাকথিত ন্যায়সংগত যুদ্ধের প্রচলিত তত্ত্বটিকেও পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান ও নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন যে, রাজনৈতিক স্বার্থে যেকোনো অন্যায় যুদ্ধকে জনগণের সামনে বৈধ বা জায়েজ করতে যুগে যুগে এই পুরোনো তত্ত্বটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা বর্তমান যুগের বাস্তবতায় সম্পূর্ণ অচল এবং অর্থহীন। আধুনিক যুগে মারণাস্ত্রের এই অবাধ ব্যবহার মূলত মানুষের সাথে মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও সম্পর্কের চরম অভাবকে ফুটিয়ে তোলে। আর এই সমস্ত যুদ্ধবিগ্রহের ফলে শেষ পর্যন্ত সাধারণ ও নিরপরাধ মানুষের জীবনের ওপর এক ভয়াবহ ও অপূরণীয় বিপর্যয় নেমে আসে, যার খেসারত দিতে হয় পুরো মানবজাতিকে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল