প্রিন্ট এর তারিখ : ২৬ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৬ মে ২০২৬
কঙ্গোয় ইবোলা আতঙ্ক, সন্দেহভাজন রোগী হাজারের কাছাকাছি
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
আফ্রিকার মধ্যাঞ্চলীয় দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে অত্যন্ত প্রাণঘাতী ও সংক্রামক ইবোলা ভাইরাসের নতুন প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশটিতে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন, যা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটিতে ইতিমধ্যে ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এমন সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৯০০-এর কোটা ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে অন্তত ১০১ জন রোগীর শরীরে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে এই বিপজ্জনক ভাইরাসের উপস্থিতি শতভাগ নিশ্চিত হওয়া গেছে। পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাওয়ায় কঙ্গো সরকার গত ১৫ মে দেশটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ইবোলা মহামারীর ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়।ঐতিহাসিকভাবে কঙ্গোর সাথে এই ভাইরাসের সম্পর্ক বেশ পুরোনো। ১৯৭৬ সালে এই কঙ্গো ভূখণ্ডেই পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইবোলা ভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছিল। সেই হিসেবে এবারের প্রাদুর্ভাবটি দেশটিতে ১৭তম বারের মতো আঘাত হানল। কঙ্গো সরকারের মহামারী ঘোষণার মাত্র দুই দিন পর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কঙ্গো এবং তার প্রতিবেশী রাষ্ট্র উগান্ডায় ছড়িয়ে পড়া ইবোলার বিশেষ ‘বুন্দিবুগিও’ ধরনটিকে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করে। তবে আশার কথা হলো, সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার মতো অবস্থায় না পৌঁছানোয় এটিকে প্যান্ডেমিক বা বৈশ্বিক মহামারী স্তরের জরুরি অবস্থা হিসেবে অভিহিত করা হয়নি।তবে মাঠ পর্যায়ের বাস্তব চিত্র অত্যন্ত জটিল ও ভয়াবহ। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিশেষ বিবৃতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়াসুস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি জানান, এবারের মহামারীর প্রধান উপকেন্দ্র বা মূল কেন্দ্রস্থল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে দেশটির ইতুরি প্রদেশ। দুর্ভাগ্যবশত, এই প্রদেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে তীব্র সহিংসতা ও সংঘাত চলছে। এই চলমান যুদ্ধাবস্থার কারণে লাখ লাখ মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের উদ্বাস্তু হয়ে পড়া এবং এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় অনবরত স্থানান্তরের কারণে ভাইরাসটিকে নিয়ন্ত্রণে আনার সব ধরনের প্রচেষ্টা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং এটি আরও জট পাকিয়ে যাচ্ছে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান আরও বিশদভাবে পরিস্থিতি তুলে ধরে লিখেছেন যে, প্রায় ৫০ লাখের মতো মানুষ বর্তমানে এই চরম সংঘাতময় ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে জীবনযাপন করছেন। সেখানকার বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা এতটাই ভঙ্গুর যে, প্রতি চারজন নাগরিকের মধ্যে অন্তত একজনের জরুরি মানবিক সহায়তার প্রয়োজন হচ্ছে। একই সাথে প্রতি পাঁচজন মানুষের মধ্যে একজন নিজের ভিটেমাটি হারিয়ে দেশের ভেতরেই অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত যাযাবরের মতো জীবন কাটাচ্ছেন। এমন একটি অস্থিতিশীল পরিবেশে ইবোলায় আক্রান্ত রোগীদের সংস্পর্শে কারা কারা এসেছেন, তাঁদের খুঁজে বের করা অর্থাৎ রোগী শনাক্তকরণের কাজ নিখুঁতভাবে করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। একই সাথে প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দেওয়া মাত্রই রোগীকে আলাদা করে চিকিৎসা দেওয়া এবং দ্রুত সংক্রমণ পরীক্ষা করার পুরো প্রক্রিয়াটিই যুদ্ধের কারণে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এত বাধা ও চরম নিরাপত্তার অভাব থাকা সত্ত্বেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও তাদের সহযোগী অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ ইতুরির সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং দুর্গম এলাকাগুলোতে প্রাণ বাজি রেখে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে।চিকিৎসকদের মতে, এই অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ শুধু ইবোলাতেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিনের অপুষ্টি, কলেরার মতো অন্যান্য একাধিক রোগব্যাধির কারণে ওই নির্দিষ্ট এলাকায় একটি সামগ্রিক স্বাস্থ্য সংকট বা বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। এই বহুমুখী সংকট মোকাবিলা করার পাশাপাশি চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর স্থানীয় সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আর এ জন্য সেখানে শুধু ইবোলার চিকিৎসা নয়, বরং একটি ব্যাপকভিত্তিক ও সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম দ্রুত পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।বিজ্ঞানীদের মতে, ইবোলার এই ‘বুন্দিবুগিও’ ধরনটি অত্যন্ত বিরল এবং মারাত্মক। এটি ২০০৭ সালে পার্শ্ববর্তী দেশ উগান্ডায় প্রথমবার মানুষের শরীরে ধরা পড়েছিল। এই ধরনটির ভয়াবহতা এত বেশি যে, এতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রোগীই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। বন্যপ্রাণী গবেষকদের ধারণা, বনের ফলখেকো বাদুড় মূলত প্রাকৃতিকভাবে এই ভাইরাসের জীবাণু বহন করে থাকে। পরবর্তীতে বনের আক্রান্ত কোনো পশুপাখি শিকার করা অথবা আক্রান্ত রোগীর শরীরের যেকোনো ধরনের তরল পদার্থের সরাসরি সংস্পর্শে আসার মাধ্যমেই এই ভাইরাসটি খুব দ্রুত মানুষের শরীরে প্রবেশ করে এবং একজন থেকে অন্যজনে ছড়াতে থাকে।সবচেয়ে উদ্বেগের এবং ভয়ের বিষয় হলো, বিজ্ঞানের এত অগ্রগতির পরও ইবোলার এই নির্দিষ্ট ধরনটির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য এখন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে অনুমোদিত কোনো প্রতিষেধক বা কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরি করা সম্ভব হয়নি। তবে এই অন্ধকার পরিস্থিতির মধ্যেও আশার আলো দেখাচ্ছেন যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানীরা। করোনাভাইরাস মহামারীর সময় যে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত টিকা আবিষ্কার করা হয়েছিল, ঠিক সেই প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করেই ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা এখন ইবোলার এই বিরল ধরনের একটি পরীক্ষামূলক প্রতিষেধক তৈরির কাজ রাতদিন চালিয়ে যাচ্ছেন। গবেষকরা আশা প্রকাশ করেছেন যে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই এই নতুন টিকাটি মানবদেহে পরীক্ষার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত করা সম্ভব হবে। যদিও চূড়ান্ত পরীক্ষার আগে এর কার্যকারিতা ঠিক কতটা শক্তিশালী হবে, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।কঙ্গোর এই বর্তমান ইবোলা প্রাদুর্ভাবের সার্বিক ঝুঁকি বিবেচনা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দেশটির ভেতরের ঝুঁকিকে ‘উচ্চ’ স্তর থেকে বাড়িয়ে ‘অত্যন্ত উচ্চ’ স্তরে উন্নীত করেছে। তবে ভৌগোলিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক যাতায়াত ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে এই ভাইরাসটি এই মুহূর্তে কঙ্গোর সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে অন্যান্য মহাদেশ বা দেশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এখনো বেশ কম বলেই আশ্বস্ত করেছে সংস্থাটি।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল