প্রিন্ট এর তারিখ : ২৫ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৫ মে ২০২৬
ফুটবল নয়, নজরদারির যন্ত্র—বিশ্বকাপ বলেই ধরা পড়বে গোপন স্পর্শ
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
আধুনিক ফুটবল আর কেবল মাঠের সাধারণ একটি খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং উন্নত প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এটি এখন পুরোপুরি একটি অত্যাধুনিক ও বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়েছে। আসন্ন ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে ব্যবহৃত হতে যাওয়া অফিশিয়াল ম্যাচ বল ‘ট্রিওন্ডা’ ক্রীড়া জগতের এই বিশাল ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের এক অন্যতম বড় উদাহরণ।বিশ্বকাপের এই বলটি কেবল গোল করা বা একে অপরের দিকে পাস দেওয়ার মতো প্রথাগত কাজের জন্য তৈরি করা হয়নি, বরং এটি সবুজ মাঠের প্রতি মুহূর্তের খুঁটিনাটি নিখুঁতভাবে রেকর্ড করার মতো একটি জীবন্ত ট্র্যাকিং যন্ত্র হিসেবেও কাজ করবে। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ খেলা চলাকালীন বলের গতিবেগ, ঘূর্ণনের হার, মাঠের ঠিক কোন অবস্থানে এটি রয়েছে এবং ফুটবলারদের শরীরের প্রতিটি সূক্ষ্ম স্পর্শ মুহূর্তের মধ্যেই এই বলটি নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম হবে।বিশ্বখ্যাত ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাসের তৈরি এই বলটির ভেতরে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে স্থাপন করা হয়েছে ৫০০ হার্টজ গতিসম্পন্ন একটি মোশন সেন্সর চিপ। এই বিশেষ চিপটি খেলা চলাকালীন প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৫০০ বার বলের বিভিন্ন ধরনের ডেটা বা তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। ফলে মাঠের কোনো খেলোয়াড় ঠিক কোন মুহূর্তে বলটি স্পর্শ করেছেন, কত তীব্র গতিতে কিক বা শট মেরেছেন কিংবা বলটি কোন অভিমুখে কতটুকু ঘুরেছে, তার সবকিছুই বিন্দুমাত্র ভুল ছাড়া একদম নিখুঁতভাবে ধরা পড়বে কম্পিউটারের পর্দায়।এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সংযোজনের ফলে মাঠের ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিডিও সহকারী রেফারি ব্যবস্থাও আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও কার্যকর হয়ে উঠবে। স্টেডিয়ামের চারপাশে বসানো উচ্চ ক্ষমতার ক্যামেরা এবং বলের ভেতরে থাকা সেন্সর একসাথে সমন্বিতভাবে কাজ করে পুরো ম্যাচের একটি ডিজিটাল ত্রিমাত্রিক চিত্র তৈরি করবে। এর ফলে অফসাইড, হ্যান্ডবল বা যেকোনো ধরনের বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো রেফারিদের পক্ষে অত্যন্ত দ্রুত এবং সম্পূর্ণ নির্ভুলভাবে নেওয়া সম্ভব হবে, যা মাঠের অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক অনেকটাই কমিয়ে দেবে।তবে এই বিশেষ প্রযুক্তির বল ব্যবহারের ক্ষেত্রে ফুটবল মাঠে একটি সম্পূর্ণ নতুন এবং ব্যতিক্রমী বিষয় যুক্ত হতে যাচ্ছে। প্রতিটি ম্যাচের আনুষ্ঠানিক বাঁশি বাজার আগে এই ট্রিওন্ডা বলটিকে বৈদ্যুতিক লাইনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ চার্জ বা শক্তিপূর্ণ করে নিতে হবে। কারণ এর ভেতরের চিপ ও সেন্সরটি একটি বিশেষ ব্যাটারির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এই ব্যাটারিটি একবার পুরোপুরি চার্জ দিলে টানা প্রায় ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত বলটিকে সম্পূর্ণ সচল ও কার্যকর রাখতে পারে।প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের পাশাপাশি বলটির বাহ্যিক নকশাতেও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে দারুণ এক নান্দনিক বৈশিষ্ট্য। এই বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর সংস্কৃতি ও মেলবন্ধনকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে বলের গায়ে এই তিন দেশের জাতীয় পতাকার রঙের ছোঁয়া ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি ‘ট্রিওন্ডা’ নামটি নির্বাচন করা হয়েছে মূলত তিন তরঙ্গের বিশেষ ধারণা থেকে, যা এই আয়োজক তিন দেশের ঐক্য ও শক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার মতে, এই সংযুক্ত বল প্রযুক্তি আগামী দিনে ফুটবলের পুরো ভবিষ্যৎকেই বদলে দেবে। এটি মাঠে শুধু খেলার গতি ও সৌন্দর্যই বাড়াবে না, বরং মাঠের রেফারিং সিদ্ধান্তগুলোকে আরও বেশি স্বচ্ছ, নির্ভুল এবং প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলবে। সব মিলিয়ে ১০৪টি ম্যাচের এই বিশাল ও ঐতিহাসিক বিশ্বকাপে ট্রিওন্ডা বলটি হয়ে উঠতে পারে মাঠের ভেতরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং আকর্ষনীয় প্রযুক্তিগত উপাদান।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল