প্রিন্ট এর তারিখ : ২৪ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৪ মে ২০২৬
এআইয়ের ধাক্কায় বদলে যাচ্ছে ইন্টারনেট ব্যবহারের চিরচেনা রূপরেখা
তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক ||
বর্তমান যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানুষের সামগ্রিক ইন্টারনেট ব্যবহারের চিরচেনা ধরনকে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে বদলে দিচ্ছে। বিশেষ করে অনলাইন তথ্য অনুসন্ধান বা সার্চ ইঞ্জিন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন কেনাকাটা বা ই-কমার্সের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি এক বৈপ্লবিক রূপান্তর নিয়ে এসেছে। বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা এখন আর আগের মতো শুধু দু-একটি শব্দ লিখে তথ্য খুঁজছেন না, বরং তারা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল, দীর্ঘ এবং মানুষের সাথে কথা বলার মতো বিস্তারিত প্রশ্ন করছেন। ব্যবহারকারীদের আচরণের এই নাটকীয় পরিবর্তন ইন্টারনেটের ভেতরের কাজের কাঠামো এবং এর মৌলিক রূপরেখাকেই সম্পূর্ণ নতুন করে গড়ে তুলছে।বিশ্ববিখ্যাত সার্চ ইঞ্জিন গুগলের অনুসন্ধান বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট রবি স্টেইন এই প্রযুক্তির প্রভাব ও পরিবর্তন সম্পর্কে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তিনি জানান যে, মানুষ এখন এমন সব জটিল ও সূক্ষ্ম বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করছে যার সরাসরি বা এক লাইনের উত্তর সাধারণ ইন্টারনেটে সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। মানুষের এই নতুন চাহিদাকে মেটাতেই গুগল তাদের পুরো সার্চ ব্যবস্থায় একটি বড় ধরনের আধুনিকায়ন ও পরিবর্তন আনছে। এখন থেকে বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে গভীর তথ্য বিশ্লেষণ ও সংগ্রহ করে তা ছবি, নকশা ও অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে ব্যবহারকারীদের সামনে উপস্থাপন করা হবে, যেন মানুষ সহজেই সব বুঝতে পারে।প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্টারনেট দুনিয়ায় এখন শুধু নির্দিষ্ট কিছু শব্দ বা কীওয়ার্ড ব্যবহারের দিন ফুরিয়ে আসছে। মানুষ এখন সার্চ বক্সে পুরো একটি বাক্য কিংবা কারো সাথে কথা বলার ভঙ্গিতে প্রশ্ন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। সার্চ ইঞ্জিন অপ্টিমাইজেশন বা এসইও সংক্রান্ত বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান সেমরাশের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ এবং কথোপকথনভিত্তিক তথ্য খোঁজার এই প্রবণতা দিন দিন বেশ চমৎকারভাবে বাড়ছে, যদিও এখনো অনেক ব্যবহারকারী সংক্ষিপ্ত শব্দ লিখেও সার্চ করে থাকেন। তবে গুগল নিশ্চিত করেছে যে, কোনো ছবি বা কম্পিউটারের পর্দার নির্দিষ্ট কোনো অংশ ব্যবহার করে তথ্য খোঁজার প্রবণতা প্রতি বছর প্রায় ৬০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর পাশাপাশি তাদের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সমৃদ্ধ বিশেষ মোড ব্যবহারের হারও জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, যা মানুষের তথ্য খোঁজার অভিজ্ঞতাকে আরও দীর্ঘ এবং আলাপচারিতাভিত্তিক করে তুলছে।ওপেনএআই-এর তৈরি চ্যাটজিপিটি মানুষের তথ্য খোঁজার এই মজ্জাগত অভ্যাসে সবচেয়ে বড় ও দৃশ্যমান পরিবর্তনটি এনেছে। সাধারণ মানুষ এখন যেকোনো বড় তথ্যের সহজ সারসংক্ষেপ তৈরি করা, বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে নিখুঁত তুলনা করা এবং নতুন কোনো কনটেন্ট বা লেখা তৈরির জন্য আলাদা আলাদা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টুল ব্যবহার করতে শুরু করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ব্যবহারকারীরা চ্যাটজিপিটি থেকে কোনো প্রাথমিক ধারণা বা তথ্য পেয়ে তা আরও বিস্তারিত যাচাই করার জন্য আবার গুগলে ফিরে যাচ্ছেন। প্রযুক্তি দুনিয়ায় দুটি ভিন্নধর্মী প্ল্যাটফর্মের এই মিলিত ব্যবহার এক নতুন ও দারুণ প্রবণতার জন্ম দিয়েছে।তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই জাদুকরী প্রভাব শুধু তথ্য খোঁজার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জগতেও খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বর্তমানে ইন্টারনেটে ভার্চুয়াল এবং সম্পূর্ণ এআই-নির্ভর ইনফ্লুয়েন্সার বা প্রচারক তৈরি হচ্ছে, যারা হুবহু বাস্তব মানুষের মতো নান্দনিক কনটেন্ট তৈরি করছে এবং তা সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তুলছে। বিখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটা প্ল্যাটফর্মস এবং গুগল যৌথভাবে নিত্যনতুন এআই মডেল, চ্যাট করার বিশেষ সুবিধা এবং ভার্চুয়াল অবয়ব বা অ্যাভাটার প্রযুক্তি নিয়ে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে, যা আগামী দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের অভিজ্ঞতাকে আরও আমূল বদলে দেবে।অনলাইন কেনাকাটার জগতেও এই প্রযুক্তির কল্যাণে এক বিশাল জোয়ার দেখা যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত বিশেষ টুল ব্যবহার করার ফলে বিভিন্ন খুচরা বিক্রয়কারী বা রিটেইল ওয়েবসাইটের দর্শক সমাগম বা ট্র্যাফিক কয়েকশ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। অ্যামাজনসহ বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এখন উন্নত মানের এআই শপিং অ্যাসিস্ট্যান্ট বা কেনাকাটার ভার্চুয়াল সহকারী এবং পণ্য তুলনা করার আধুনিক টুল তৈরি করছে, যার ফলে সাধারণ ক্রেতারা খুব সহজেই যেকোনো পণ্য কেনার সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। এই দৌড়ে পিছিয়ে নেই গুগলও, তারা বাজারে নিয়ে এসেছে এক নতুন ইউনিভার্সাল শপিং কার্ট বা সর্বজনীন কেনাকাটার থলি, যার মাধ্যমে একজন ক্রেতা বিভিন্ন অনলাইন দোকানের পছন্দ হওয়া পণ্যগুলোকে এক জায়গায় একসঙ্গে যুক্ত করে সহজেই কেনাকাটা শেষ করতে পারবেন। এটি মানুষের কেনাকাটার অভিজ্ঞতাকে বহুগুণ সহজ, নিরবচ্ছিন্ন ও একীভূত করে তুলেছে।ডিজিটাল বিপণন বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সরাসরি প্রশ্নের নিখুঁত উত্তর দিয়ে দেওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন ওয়েবসাইটের মূল লিংকে মানুষের ক্লিক করার হার কিছুটা কমে যেতে পারে। তবে আশার কথা হলো, যারা শেষ পর্যন্ত মূল লিংকে ক্লিক করবেন, তারা হবেন অত্যন্ত কার্যকর ও প্রকৃত ব্যবহারকারী—যারা মূলত কোনো পণ্য কেনা বা হোটেল-টিকিট বুকিংয়ের মতো চূড়ান্ত কাজগুলো সম্পন্ন করবেন। সব মিলিয়ে প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা একমত হয়েছেন যে, বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট ব্যবস্থা এখন এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তথ্য অনুসন্ধান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা অনলাইন শপিং—সব ক্ষেত্রেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন ধীরে ধীরে মূল চালিকাশক্তি বা কেন্দ্রীয় ভূমিকায় চলে আসছে, যা অদূর ভবিষ্যতে আমাদের চেনা ইন্টারনেটকে সম্পূর্ণ নতুন এবং এক অভাবনীয় রূপ দান করবে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল