প্রিন্ট এর তারিখ : ২৪ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৪ মে ২০২৬
ইরান-ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে চাপে ছিলেন পদত্যাগী মার্কিন গোয়েন্দাপ্রধান
শামিমা লিয়া, আন্তর্জাতিক ডেস্ক এডিটর ||
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালকের পদ থেকে তুলসি গ্যাবার্ডের আকস্মিক পদত্যাগের নেপথ্যে ওয়াশিংটনের ক্ষমতা অলিন্দের এক গভীর ও নজিরবিহীন টানাপোড়েনের চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরান এবং ভেনেজুয়েলা সংক্রান্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী বৈদেশিক নীতি এবং সামরিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে তীব্র মতবিরোধের কারণে প্রশাসনের ভেতরে তিনি ক্রমশ কোনঠাসা ও প্রান্তিক অবস্থানে চলে গিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মূলত গ্যাবার্ডের যুদ্ধবিরোধী অবস্থান, অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি এবং আমেরিকা প্রথম সংক্রান্ত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাকে এই শীর্ষ পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এই বিশেষ রাজনৈতিক দর্শনের কারণেই তিনি পূর্বে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ত্যাগ করে রিপাবলিকান শিবিরে যোগ দিয়ে ট্রাম্পের অন্যতম বিশ্বস্ত সহযোগী হয়ে উঠেছিলেন। তবে হোয়াইট হাউজের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বসার পর থেকেই ট্রাম্পের যুদ্ধবাজ উপদেষ্টাদের সাথে তার আদর্শিক সংঘাত শুরু হয়।প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ইরান ও ভেনেজুয়েলা সংকটে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর সামরিক পদক্ষেপের পরিকল্পনার সঙ্গে গ্যাবার্ডের যুদ্ধবিরোধী অবস্থান বারবার সাংঘর্ষিক রূপ নেয়। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আমেরিকার সম্ভাব্য সামরিক হামলার বিরোধিতা করে তিনি প্রকাশ্যে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেছিলেন যে, মার্কিন প্রশাসনের এমন অবিবেচকের মতো সিদ্ধান্ত বিশ্বকে এক পারমাণবিক ধ্বংসের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তার এই প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি হোয়াইট হাউজের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষের জন্ম দেয়। শুধু তাই নয়, মার্কিন কংগ্রেসে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় গ্যাবার্ড স্পষ্ট করে জানান যে, ইরান এখনই চূড়ান্তভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে যাচ্ছে—এমন কোনো অকাট্য প্রমাণ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে নেই। এই বক্তব্যটি মার্কিন প্রশাসন এবং তাদের পরম মিত্র ইসরাইলের কঠোর অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীতে চলে যায়, যার খেসারত হিসেবে প্রশাসনের ভেতরে তার প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা এক ধাক্কায় অনেকটা কমে যায়। একইভাবে ভেনেজুয়েলা সংকট নিরসনেও তিনি যেকোনো ধরণের সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের প্রভাবশালী কর্মকর্তারা যখন ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযানের গোপন নীল নকশা তৈরি করছিলেন, তখন গ্যাবার্ডকে সেইসব নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখা হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।অভিযোগ উঠেছে, একাধিক বড় ও সংবেদনশীল বৈদেশিক নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এই জাতীয় গোয়েন্দা প্রধানকে নিয়মিতভাবে পাশ কাটানো হতো। এমনকি জাতীয় নিরাপত্তার মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর বৈঠকেও তার উপস্থিতি ইচ্ছা করেই সীমিত করে দেওয়া হয়েছিল। এর একটি বড় উদাহরণ স্পষ্ট হয় যখন ভেনেজুয়েলা নিয়ে মার্কিন সামরিক অভিযানের চূড়ান্ত রূপরেখা সাজাতে ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসোর্টে এক জরুরি গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে ট্রাম্পের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা রুবিও এবং সিআইএর পরিচালকসহ অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অংশ নিলেও জাতীয় গোয়েন্দা প্রধান হওয়া সত্ত্বেও গ্যাবার্ডকে সেই আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছিল। পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয় যখন ট্রাম্প ইসরাইলের সাথে যৌথভাবে ইরানের ওপর সরাসরি বিমান হামলা শুরু করেন। সেই যুদ্ধকালীন মুহূর্তে গ্যাবার্ডকে দেখা যায় ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং মন্ত্রিসভার অন্যান্য সাধারণ সদস্যদের সাথে ওয়াশিংটনে অবস্থান করতে। অথচ সেই সময়ে ট্রাম্প সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস চেয়ারম্যান ড্যান কেইনসহ শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের নিয়ে মার-এ-লাগোতে বসেই যুদ্ধের নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, কাগজে-কলমে গোয়েন্দা প্রধান হলেও আসল ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে তাকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছিল।প্রশাসনের ভেতরের এই অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের পাশাপাশি সিআইএ নেতৃত্বের সাথেও গ্যাবার্ডের সম্পর্ক চরম বৈরী রূপ ধারণ করেছিল। তিনি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কিছু একপেশে সিদ্ধান্ত এবং যুদ্ধংদেহী তথ্য বিশ্লেষণের ওপর তীব্র আস্থাহীনতা প্রকাশ করেছিলেন। এর বিপরীতে তিনি মার্কিন গোয়েন্দা সম্প্রদায়ের বিশাল জনবলের ওপর নির্ভর না করে নিজের দপ্তরের অত্যন্ত সীমিত সংখ্যক বিশ্বস্ত উপদেষ্টার ওপর ভরসা করতে শুরু করেন, যা তাকে মূল ধারা থেকে আরও বিচ্ছিন্ন করে দেয়। যদিও তার দপ্তরের পক্ষ থেকে পরবর্তীতে এই আস্থাহীনতার অভিযোগ অস্বীকার করা হয় এবং দাবি করা হয় যে তিনি নিরাপত্তা দলের সাথে সমন্বয় করেই কাজ করেছেন, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন বার্তা দিচ্ছিল। এর মধ্যে তিনি ট্রাম্পের বিগত নির্বাচনের কারচুপি সংক্রান্ত কিছু অভিযোগ ও গোয়েন্দা নথি প্রকাশের বিতর্কিত তদন্তমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন, যা তাকে মূল কৌশলগত বৈদেশিক নীতি থেকে আরও দূরে সরিয়ে দেয়। দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে চলা এমন তীব্র মানসিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পর অবশেষে তিনি পদত্যাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। অবশ্য রাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত জীবনের কিছু সমস্যা, বিশেষ করে স্বামীর গুরুতর অসুস্থতাও এই পদত্যাগের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। তার এই বিদায়ের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রকাশ্যে তার কাজের বেশ প্রশংসা করলেও প্রশাসনের ভেতরে ইরান ও ভেনেজুয়েলা নীতি নিয়ে যে গভীর ফাটল ধরেছিল, সেই তেতো সত্যটি হোয়াইট হাউজ বরাবরের মতোই আড়াল করার চেষ্টা করেছে।সূত্র: সিএনএন
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল