প্রিন্ট এর তারিখ : ২৪ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৪ মে ২০২৬
অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বিশাল প্রণোদনা ঘোষণা
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
দেশের অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা পুনরায় চালু করার লক্ষ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই মহাপরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করা, রপ্তানি খাতকে শক্তিশালী করা এবং নতুন করে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এই বিশাল উদ্যোগের মাধ্যমে দেশে ২৫ লাখেরও বেশি মানুষের নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে।শনিবার দুপুরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত একটি বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রণোদনা প্যাকেজের বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট এবং ব্যাংক খাতের কিছু রূঢ় বাস্তবতা সাধারণ মানুষের সামনে প্রকাশ করেন।গভর্নর জানান, গত তিন বছরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়েছে। পূর্বে যেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ, তা পরবর্তীতে কমে ৪ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসে এবং বর্তমানে এই প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, সিরামিক, তথ্যপ্রযুক্তি এবং সাধারণ উৎপাদন খাতে বড় ধরনের মন্দা দেখা দিয়েছে। এর পাশাপাশি ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার এবং আমানতকারীদের আস্থা কমে যাওয়ার মতো গুরুতর সমস্যা তৈরি হয়েছে। উচ্চ সুদের হারের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাও তাদের ব্যবসা বাড়াতে পারছিলেন না। এই সামগ্রিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করতেই সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক মিলে এই বিশেষ স্কিম বা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।ঘোষিত এই ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা জোগান দেবে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এবং বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন বা রিফাইন্যান্স করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই ঋণের ক্ষেত্রে সাধারণ গ্রাহকদের মাত্র সাত শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে, কারণ বাকি ছয় শতাংশ সুদ সরকার নিজে ভর্তুকি হিসেবে বহন করবে। তবে যেসব ব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত অলস টাকা রয়েছে, তাদের কাছ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১০ শতাংশ সুদে এই তহবিল সংগ্রহ করবে, যার মধ্যে সরকার দেবে ছয় শতাংশ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেবে চার শতাংশ।তহবিলের বণ্টন ব্যবস্থা অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে সাজানো হয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ৪১ হাজার কোটি টাকার মধ্যে বন্ধ শিল্পকারখানা ও সেবা খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা, কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা সিএমএসএমই খাতে পাঁচ হাজার কোটি টাকা, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ১০ হাজার কোটি টাকা এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও উত্তরবঙ্গকে কৃষির প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে তিন হাজার কোটি টাকা করে মোট ছয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব ১৯ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে রপ্তানি খাতের জাহাজীকরণ পূর্ব ঋণের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা, চামড়া শিল্পে দুই হাজার কোটি টাকা, হিমায়িত মাছ রপ্তানিতে দুই হাজার কোটি টাকা এবং বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনীতি, পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের জন্য এক হাজার কোটি টাকা করে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া নতুন উদ্ভাবনী ব্যবসা বা স্টার্টআপ এবং সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য ৫০০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে সৃজনশীল অর্থনীতির টাকাটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল থেকে খরচ করবে।অতীতের করোনা কালীন প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ নিয়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও পরবর্তীতে তা খেলাপি হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হলে গভর্নর অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে আশ্বস্ত করেন যে, এবার কোনো বড় গোষ্ঠী বা প্রভাবশালী পক্ষ একাই সব টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে না। এবার ঋণ বিতরণের নিয়মকানুন অত্যন্ত কঠোর করা হয়েছে এবং কোনো চিহ্নিত বা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি এই তহবিল থেকে কোনোভাবেই ঋণ পাবেন না। ব্যাংকগুলো যখন পুরোপুরি নিশ্চিত হবে যে কোনো গ্রাহক আসলেই উপযুক্ত, তখনই কেবল ঋণ দেওয়া হবে এবং পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই টাকার বিপরীতে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা দেবে। এই প্রক্রিয়ায় নতুন করে কোনো টাকা ছাপানো হবে না, ফলে বাজারে অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহ বা মূল্যস্ফীতি বাড়ার কোনো ঝুঁকি নেই।সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংক খাতের অনিয়ম নিয়ে এক বিস্ফোরক মন্তব্য করে গভর্নর বলেন, দেশের ব্যাংক খাত থেকে প্রায় পাঁচ লাখ কোটি টাকা চুরি হয়ে গেছে। তথাকথিত ভদ্র ভাষায় এটিকে খেলাপি ঋণ বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি চুরি এবং এই চুরির বেশিরভাগ টাকাই বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। এই বিপুল পরিমাণ পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ বিষয়, কারণ চুরির সম্পদের বেশিরভাগেরই সঠিক ও বৈধ কোনো কাগজপত্র নেই। তবুও বর্তমান সরকার এই টাকা উদ্ধার করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং এর জন্য একটি বিশেষ দেওয়ানি বা অর্থ আদালত সংক্রান্ত আইন তৈরি করা হচ্ছে, যা পাস হলে দ্রুত টাকা উদ্ধার করা সম্ভব হবে।ডলারের বিপরীতে দেশীয় মুদ্রার মান প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখতে একক গ্রাহক ঋণসীমা বাড়ানো হয়েছে বলেও গভর্নর উল্লেখ করেন। ব্যাংকগুলো সম্পূর্ণ নিজস্ব যাচাই-বাছাই ও ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনা করেই এই ঋণ বিতরণ করবে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল