প্রিন্ট এর তারিখ : ২৪ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৩ মে ২০২৬
ইরান যুদ্ধের খরচের ২৫ গুণ উঠেছে ভেনেজুয়েলার তেল থেকে: ট্রাম্প
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি এবং জ্বালানি কূটনীতিতে নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরান এবং ভেনেজুয়েলার ওপর মার্কিন প্রশাসনের নানামুখী পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন। ট্রাম্পের মতে, ভেনেজুয়েলা থেকে সংগৃহীত তেলের বিশাল অর্থনৈতিক আয় ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের সামরিক ও কৌশলগত যুদ্ধের ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ২৫ গুণ বেশি অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় তহবিলে এনে দিয়েছে। তার এই প্রকাশ্য বক্তব্য বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মাঝে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে, কারণ এর মাধ্যমে ওয়াশিংটনের বৈশ্বিক জ্বালানি কৌশলের একটি বড় বাণিজ্যিক রূপ সামনে চলে এসেছে।বিশ্বরাজনীতি ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সাম্প্রতিক এক জনাকীর্ণ বক্তব্যে ট্রাম্প সরাসরি ভেনেজুয়েলা ও ইরান প্রসঙ্গ টেনে আনেন। মার্কিন প্রশাসনের অর্জনের খতিয়ান তুলে ধরে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে তিনি বলেন যে, ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে তাদের গৃহীত নীতি ও কৌশল মোটেও খারাপ ছিল না, বরং তা প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি সফল হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলা থেকে এত বিপুল পরিমাণ তেল ও জ্বালানি সম্পদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনেছে বা ব্যবহার করেছে, যা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য বজায় রাখার যাবতীয় খরচকে বহুলাংশে ছাড়িয়ে গেছে এবং সেই ব্যয়ের প্রায় ২৫ গুণ অর্থ মার্কিন অর্থনীতিতে ফিরিয়ে এনেছে।প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই মন্তব্যটি এমন একটি স্পর্শকাতর সময়ে সামনে এলো যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং পেন্টাগনের ব্যয় নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সদরদপ্তর পেন্টাগনের সাম্প্রতিক দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের শুরু পর্যন্ত ইরানের বৈরী আচরণ প্রতিরোধ ও দেশটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সামরিক অভিযান পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার। তবে এই হিসাব কেবল সরকারি খাতার; বিভিন্ন স্বাধীন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক, সামরিক বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে চাপে রাখতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত খরচের পরিমাণ এই ঘোষিত অঙ্কের চেয়ে আরও অনেক বেশি হতে পারে। আর এই বিশাল খরচের অংককেই ভেনেজুয়েলার তেল থেকে প্রাপ্ত আয়ের সাথে তুলনা করে বড় জয়ের দাবি করলেন ট্রাম্প।নিজের বক্তব্যে ভেনেজুয়েলাকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক কৌশলের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিশদভাবে তুলে ধরেন ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেন যে, লাতিন আমেরিকার এই দেশটির তেল উৎপাদন, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট ও তেল রপ্তানি প্রক্রিয়ার ওপর মার্কিন প্রভাব বিস্তার কেবল একটি ভূরাজনৈতিক চাল ছিল না, বরং এর পেছনে বড় ধরনের অর্থনৈতিক লাভের অঙ্ক জড়িত ছিল। তার এই বক্তব্যের পর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক মঞ্চে যতই গণতন্ত্র বা মানবাধিকারের কথা বলুক না কেন, দিনশেষে প্রাকৃতিক সম্পদ ও তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই তাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।ট্রাম্পের এই বিস্ফোরক বক্তব্যকে সাধারণ কোনো রাজনৈতিক মন্তব্য হিসেবে দেখছেন না আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল। অনেকেই মনে করছেন, এটি মূলত মার্কিন ভোটার এবং করদাতাদের বোঝানোর একটি কৌশল, যেখানে সামরিক ব্যয়ের চেয়ে অর্থনৈতিক লাভ যে অনেক বেশি হয়েছে তা প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, একটি সার্বভৌম দেশের প্রাকৃতিক সম্পদকে অন্য একটি দেশের যুদ্ধের খরচের সমীকরণ হিসেবে ব্যবহার করার এই প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি বিশ্বমঞ্চে নতুন বিতর্ক ও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের এই তেলের হিসাব আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও জ্বালানি রাজনীতির ভবিষ্যৎ সমীকরণকে যে আরও জটিল করে তুলবে, তা বলাই বাহুল্য।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল