প্রিন্ট এর তারিখ : ৩০ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩০ অক্টোবর ২০২৬
অভিলাষ মাহমুদ, সাব-এডিটর ||
এখনকার ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা সুকুমার রায় ও তাঁর লেখার সঙ্গে কতটা পরিচিত বলা শক্ত। ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগেও সুকুমারের কবিতার অন্তত দু-এক লাইন অথবা তাঁর ‘হযবরল’-র সঙ্গে পরিচয় ছিল না, এমন মানুষের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। দক্ষিণারঞ্জনের রূপকথার বিষয় ছেড়েই দেওয়া যাক; আধুনিক জীবনের বাস্তববাদী, যুক্তিনির্ভর ও তথ্যনিবিড় গণ্ডিতে কল্পনার প্রবেশ যেন ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে। আবেগহীন গতিময়তা আর কল্পনাশক্তির অভাব মানবজীবনকে একঘেয়ে ও যান্ত্রিক করে তুলতে বাধ্য। শরীরকে কর্মক্ষম রাখতে সুষম খাদ্যের মতোই মনকে সুন্দর ও সজীব রাখার জন্য প্রয়োজন কল্পনার বিস্তার। বাস্তব জীবনের বাঁধাধরা ছকের মাঝে সুকুমার রায়ের সৃষ্টিজগতের অনাবিল হাস্যরস ও স্বপ্নময়তা সেই অপরিহার্য খোরাক জোগায়। উদ্ভট খেয়াল রসের এই অফুরন্ত ভাণ্ডার তাই কোনো নির্দিষ্ট যুগে সীমাবদ্ধ নয়; সুকুমার রায় চিরকালই সমান প্রাসঙ্গিক। শিকড় ও বংশ পরিচয়: মসূয়া থেকে কলকাতার কর্নওয়ালিস স্ট্রিট সুকুমার রায়ের জীবন ও শিল্পচেতনাকে অনুধাবন করতে হলে তাঁর পিতা উপেন্দ্রকিশোরকে বাদ দিয়ে এগোনো অসম্ভব। বহুবিস্তৃত প্রতিভার অধিকারী উপেন্দ্রকিশোর ছিলেন একাধারে শিশুসাহিত্যিক, মুদ্রণ বিশেষজ্ঞ, চিত্রশিল্পী ও সুরসাধক; আর তাঁর হাত ধরেই আবির্ভূত হয়েছিল ছোটদের অবিস্মরণীয় মাসিক পত্রিকা ‘সন্দেশ’।১২৭০ বঙ্গাব্দের ২৮ বৈশাখ (১২ মে ১৮৬৩) অবিভক্ত বাংলার ময়মনসিংহ জেলার কটিয়াদী থানার অন্তর্গত মসূয়া গ্রামে (বর্তমানে বাংলাদেশে) এক ঐতিহ্যবাহী কায়স্থ পরিবারে উপেন্দ্রকিশোরের জন্ম হয়। পিতা কালীনাথ রায় ও মাতা জয়তারা দেবীর সংসারে ছিলেন পাঁচ পুত্র—সারদারঞ্জন, কামদারঞ্জন, মুক্তিদারঞ্জন, কুলদারঞ্জন ও প্রমদারঞ্জন এবং তিন কন্যা। বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক লীলা মজুমদার ছিলেন এই প্রমদারঞ্জনেরই কন্যা। কালীনাথের প্রতিবেশী ও অপুত্রক জ্ঞাতিভাই জমিদার হরকিশোর রায়চৌধুরীর একান্ত অনুরোধে কালীনাথ তাঁর দ্বিতীয় পুত্র কামদারঞ্জনকে দত্তক দিতে রাজি হন। ১৮৬৮ সালে দত্তক নেওয়ার পর কামদারঞ্জনের নতুন নাম রাখা হয় উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী।পরবর্তী সময়ে কলকাতায় এসে তিনি ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন। ১৮৮৫ সালের ১৫ জুন ব্রাহ্মসমাজের বিশিষ্ট সংস্কারক দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথমা স্ত্রীর কন্যা বিধুমুখীর সঙ্গে উপেন্দ্রকিশোরের বিবাহ সম্পন্ন হয়। তিনি তখন কলকাতার ১৩ নম্বর কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের ‘লাহাবাড়ি’তে বসবাস করতেন। এখানেই উপেন্দ্রকিশোর-বিধুমুখী দম্পতির প্রথম পাঁচ সন্তানের জন্ম হয়—সুখলতা, সুকুমার, পুণ্যলতা, সুবিনয় ও শান্তিলতা।১৮৮৭ সালের ৩০ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন সুকুমার রায়। পরবর্তী সময়ে স্থানাভাবের কারণে উপেন্দ্রকিশোর ১৮৯৫ সাল নাগাদ কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের বাড়ি ছেড়ে পাশেই ৩৮/১ নম্বর শিবনারায়ণ দাস লেনের বাড়িতে উঠে আসেন। সেখানেই জন্ম নেয় তাঁদের কনিষ্ঠ পুত্র ও সুকুমারের ছোট ভাই সুবিমল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে উপেন্দ্রকিশোরের সখ্য ছিল অত্যন্ত প্রগাঢ়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘রাজর্ষি’ উপন্যাসের দুই শিশু চরিত্রের নামানুসারে উপেন্দ্রকিশোরের জ্যেষ্ঠা কন্যা সুখলতা ও জ্যেষ্ঠ পুত্র সুকুমারের ডাকনাম রেখেছিলেন যথাক্রমে ‘হাসি’ শৈশব ও ‘তাতা’। বিদ্যাচর্চা ও ননসেন্স ক্লাবের উন্মেষ শৈশব থেকেই সুকুমারের বহুমুখী প্রতিভার স্ফুরণ ঘটতে থাকে। তিনি গান গাইতেন, নাটক লিখতেন ও তাতে অভিনয় করতেন, অনর্গল ছড়া বাঁধতেন। তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী সুকুমার ছিলেন স্বভাবনেতা; খেলাধুলা, গান কিংবা নাটকের মধ্য দিয়ে গোটা পরিবারকে তিনি আনন্দে মাতিয়ে রাখতেন। তাঁর মেজবোন পুণ্যলতা চক্রবর্তীর স্মৃতিচারণায় পাই:“দাদা যেমন আমাদের খেলাধুলা ও সব কিছুরই পাণ্ডা ছিল, তেমনি বন্ধুবান্ধব ও সহপাঠীদের মধ্যেও সে সর্দার হল। ... তার মধ্যে এমন কিছু বিশেষত্ব ছিল যার জন্য সবাই তাকে বেশ মানত। ... বড়রাও তার কথার বেশ মূল্য দিতেন।”খুড়তুতো বোন লীলা মজুমদার তাঁর ‘বড়দা’ সুকুমারের অবয়ব স্মরণ করে লিখেছিলেন:“চেহারার মধ্যে কি যেন একটা ছিল, যা তার সর্বাঙ্গ থেকে আলোর মত ঝড়ে পড়ত।”কলকাতার সিটি স্কুল থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে প্রবেশিকা পাস করে সুকুমার ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে। পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে ডাবল অনার্স নিয়ে ১৯০৬ সালে সেখান থেকে বিএসসি পাস করেন তিনি। কলেজে পড়ার সময়ই তিনি শিক্ষকদের স্নেহধন্য হন, যাঁদের মধ্যে ছিলেন স্বনামধন্য বিজ্ঞানী ও শিক্ষক আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়।কলেজজীবনে বন্ধুদের নিয়ে সুকুমার গড়ে তুলেছিলেন এক অভিনব নাট্য ও সাহিত্যগোষ্ঠী—‘ননসেন্স ক্লাব’। ক্লাবের মুখপত্র ছিল একটি হাতে লেখা পত্রিকা, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘সাড়ের বত্রিশ ভাজা’ (৩২॥ ভাজা)। সুকুমারের খেয়ালরসাশ্রিত লেখার প্রথম প্রকাশ ঘটেছিল এই পত্রিকার পাতাতেই। ক্লাবের বন্ধুদের নিয়ে মঞ্চস্থ করার জন্য তিনি লিখেছিলেন দুটি ঐতিহাসিক প্রহসন—‘ঝালাপালা’ ও ‘লক্ষণের শক্তিশেল’। ‘ঝালাপালা’তেই জন্ম নিয়েছিল সেই অবিস্মরণীয় সংলাপ:“পণ্ডিত। বটে! তোর বাড়ি কদ্দুর?কেষ্টা। আজ্ঞে, ওই তালতলায়— ‘আই গো আপ, ইউ গো ডাউন-’ মানে কি?পণ্ডিত। ‘আই’- ‘আই’ কিনা চক্ষুঃ, ‘গো’- গয়ে ওকার গো- গৌ গাবৌ গাবঃ, ইত্যমরঃ, ‘আপ’ কিনা আপঃ সলিলং বারি অর্থাৎ জল- গরুর চক্ষে জল- অর্থাৎ কিনা গরু কাঁদিতেছে- কেনো কাঁদিতেছে- না উই গো ডাউন, কিনা ‘উই’ যাকে বলে উইপোকা- ‘গো ডাউন’, অর্থাৎ গুদোমখানা- গুদোমঘরে উই ধরে আর কিছু রাখলে না- তাই না দেখে, ‘আই গো আপ’– গরু কেবলই কাঁদিতেছে-”ননসেন্স ক্লাবের অভিনয় দেখার জন্য বালক থেকে বৃদ্ধ—সবাই ভিড় জমাত। কোনো বাঁধাধরা স্টেজ, ভারী দৃশ্যপট বা মেকআপ ছিল না; শুধু বাচনভঙ্গি ও অঙ্গভঙ্গির অসাধারণ কুশলতায় সুকুমার সবাইকে হাসির তোড়ে ভাসিয়ে দিতেন। পুণ্যলতার কথায়, হাঁদারামের অভিনয়ে দাদার জুড়ি ছিল না।বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন ও স্বদেশপ্রেমের অনুরণন ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ব্রিটিশ বড়লাট লর্ড কার্জনের নির্দেশে কার্যকর হয়েছিল বঙ্গভঙ্গ। সেই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সংকটে বাংলার বুকে জেগে ওঠে তীব্র বয়কট ও স্বদেশি আন্দোলন। রায়চৌধুরী পরিবারও এই জাতীয় জাগরণ থেকে দূরে থাকেনি। পুণ্যলতা স্মৃতিচারণায় লিখেছিলেন, মেজভাই মণি (সুবিনয় রায়) নানা জায়গা থেকে দেশি সুতোর খসখসে মোটা কাপড়, হাতে তৈরি তুলোট কাগজ এবং ট্যারা-বাঁকা পেয়ালা-পিরিচ খুঁজে এনে বাড়িতে ব্যবহার করাতেন। লীলা মজুমদারের ভাষায়, সবাই সেই নিয়ম মানত, আর বড়দা সেই স্বদেশি আবেগ নিয়ে গান না বেঁধে কি থাকতে পারেন? সুকুমার তখন লিখেছিলেন ব্যঙ্গাত্নক স্বদেশি গান:“আমরা দেশি পাগলের দল,দেশের জন্য ভেবে ভেবে হয়েছি পাগল,(যদিও) দেখতে খারাপ টিকবে কম, দামটা একটু বেশী(তাহোক) তাতে দেশেরই মঙ্গল।”লর্ড কার্জনের চক্রান্তের বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার ব্যঙ্গ কলম থেকে বের হয়েছিল কবিতা:“লর্ড কার্জন অতি দুর্জন বঙ্গগগন শনিকূট নিঠুর চক্রী চতুর উগ্র গরল ফণী।”রবীন্দ্রসান্নিধ্য ও শান্তিনিকেতনের দিনগুলি উপেন্দ্রকিশোরের সূত্র ধরে বাল্যকাল থেকেই রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন সুকুমার। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে গভীর স্নেহের চোখে দেখতেন। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার বহু আগে থেকেই সুকুমারের সঙ্গে কবির এই অন্তরঙ্গ যোগাযোগ অক্ষুণ্ণ ছিল। কলকাতায় ডা. দ্বিজেন্দ্রনাথ মৈত্রের বাসভবনে সাহিত্য আড্ডায় সুকুমার নিয়মিত যেতেন। ১৯১১ সালের ২৫ বৈশাখ উপলক্ষে শান্তিনিকেতনের উৎসবে যোগ দেন সুকুমার ও তাঁর সঙ্গীরা। ‘পুণ্যস্মৃতি’ গ্রন্থে শান্তা ও সীতা দেবী সেই দিনের চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন। সীতাদেবী লিখেছেন, সেখানে সুকুমার দলবল নিয়ে ‘অদ্ভুত রামায়ণ’ গান করে শুনিয়েছিলেন। গানের এক জায়গায় ছিল:“ওরে ভাই, তোরে তাই কানে কানে কই রে,ওই আসে, ওই আসে, ওই ওই ওই রে।”গানটি শুনে শান্তিনিকেতনের আশ্রমের ছোট ছেলেরা সুকুমারের নামই রেখে দিয়েছিল ‘ওই আসে’। একবার একটি আশ্রমবালক খেলার মাঠে গর্তে পড়ে গিয়ে উঠতে না পেরে দূর থেকে সুকুমারকে দেখে চিৎকার করে ডেকেছিল, “ও ওই আসে, আমাকে একটু তুলে দিয়ে যাও তো!” রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ও লিখেছেন, সে সময় তাতাবাবুর চোখ গোল গোল করে গাইবার ভঙ্গি আশ্রমবাসীদের স্মৃতিতে চিরস্থায়ী হয়ে গিয়েছিল:“রাবণ রাজায় মারো, রাবণ রাজায় মারো,তারে উলটো গাধায় তোল...”মুদ্রণশিল্পে বিপ্লব, বিলেত যাত্রা ও রাজকীয় স্বীকৃতি১৮৯৫ সালে শিবনারায়ণ দাস লেনের বাড়িতে উপেন্দ্রকিশোর স্থাপন করেছিলেন ‘U. Ray’ নামের ব্লক তৈরির প্রতিষ্ঠান, যা পরবর্তীকালে পরিচিত হয় ‘U. Ray & Sons’ নামে। কোনো দিন ইংল্যান্ডে না গিয়েও উপেন্দ্রকিশোর হাফটোন প্রিন্টিং ও রিপ্রোডাকশন প্রযুক্তিতে যে যুগান্তকারী গবেষণা করেছিলেন, তা সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৮৯৭ থেকে ১৯১২ সালের মধ্যে লন্ডনের বিশ্ববিখ্যাত মুদ্রণ সাময়িকী Penrose’s Pictorial Annual-এ তাঁর নয়টি গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ ও স্বহস্তে তোলা আলোকচিত্র প্রকাশিত হয়। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা লিখেছিলেন: “Mr U. Ray of Calcutta is far ahead of European and American workers in originality.”পিতার সেই প্রযুক্তিগত সাধনাকে আধুনিকতর রূপ দিতেই সুকুমার মুদ্রণ বিদ্যায় উচ্চশিক্ষার সংকল্প নেন। ১৯১১ সালের অক্টোবরে তেইশ বছর বয়সে গুরুপ্রসন্ন বৃত্তি নিয়ে তিনি ইংল্যান্ড যাত্রা করেন। লন্ডনের County Council School of Photoengraving and Lithography-তে এক বছর অধ্যয়নের পর তিনি ম্যানচেস্টারের Municipal School of Technology-তে ক্রোমোলিথোগ্রাফি ও লিথো-ড্রয়িংয়ের উচ্চতর পাঠ নেন। লন্ডনে থাকাকালে পিতাকে পাঠানো তাঁর চিঠিগুলোতে গবেষণার খুঁটিনাটি ফুটে উঠত। পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে সুকুমার অর্জন করেন ব্রোঞ্জ পদক। তাঁর মৌলিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল Penrose’s Pictorial Annual এবং The British Journal of Photography-এর মতো অগ্রগণ্য জার্নালে। ১৯২২ সালে তিনিই ছিলেন দ্বিতীয় ভারতীয়, যিনি ইংল্যান্ডের মর্যাদাপূর্ণ ‘রয়্যাল ফটোগ্রাফিক সোসাইটি’র ফেলো (FRPS) নির্বাচিত পাশ্চাত্যে রবীন্দ্রনাথের বার্তা ও স্বদেশে প্রত্যাবর্তন হয়েছিলেন।পাশ্চাত্যে রবীন্দ্রনাথের বার্তা ও স্বদেশে প্রত্যাবর্তন ১৯১৩ সালের ২১ জুলাই লন্ডনের ‘East and West Society’-র এক বিশেষ সভায় সুকুমার রায় ‘The Spirit of Rabindranath Tagore’ শীর্ষক একটি দীর্ঘ মননশীল প্রবন্ধ পাঠ করেন। আমেরিকা থেকে লন্ডনে ফিরে অর্শ রোগের চিকিৎসার জন্য রবীন্দ্রনাথ তখন সেখানকার একটি নার্সিং হোমে ভর্তি ছিলেন। চিকিৎসাধীন কবিকে দেখতে সুকুমার প্রায়ই যেতেন। সুকুমারের পাঠ করা এই প্রবন্ধটি বিলেতের সুধীমহলে রবীন্দ্রনাথের ভাবাদর্শকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়। গবেষক প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের মতে, এটিই ছিল বিলেতের মাটিতে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে কোনো ভারতীয় পণ্ডিতের প্রথম প্রকাশ্য ভাষণ। প্রবন্ধটি পরবর্তীকালে বিখ্যাত পত্রিকা Quest-এ প্রকাশিত হয়।১৯১৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ‘সিটি অব লাহোর’ জাহাজে চেপে রবীন্দ্রনাথ ও কালীমোহন ঘোষের সঙ্গে সুকুমার ভারতে ফিরে আসেন। কুড়ি দিনের সেই দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় কবির সঙ্গে সুকুমারের সাহিত্য ও দর্শন নিয়ে কী নিবিড় কথা হয়েছিল, তা আজ আর জানার উপায় নেই। সত্যজিৎ রায় পরবর্তীকালে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, তাঁদের পরিবারের বারবার বাসস্থান পরিবর্তনের সময় পিতা ও পিতামহের বহু অমূল্য ডায়রি ও চিঠিপত্র চিরতরে হারিয়ে যায়।বিলেত থেকে ফেরার দুই মাসের মাথায়, ১৯১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে সুকুমারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন সুপ্রভা দাশ (ডাকনাম টুলু)। তিনি ছিলেন বিশিষ্ট আইনজীবী কে. জি. গুপ্তের ভাগ্নি এবং সরলা দেবী ও জগৎচন্দ্র দাশের দ্বিতীয়া কন্যা। সুপ্রভা ছিলেন সুগায়িকা এবং শান্তা ও সীতা দেবীদের বেথুন স্কুল ও কলেজের সহপাঠিনী।উপেন্দ্রকিশোর ও সুকুমার একান্ত অনুরোধ সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ প্রথমে শিলাইদহের জমিদারি তদারকির ব্যস্ততায় বিয়েতে উপস্থিত থাকতে পারবেন না বলে চিঠি দেন। কিন্তু বিয়ের মূল লগ্ন শুরুর ঠিক পূর্বমুহূর্তে সবাইকে চমকে দিয়ে কবি স্বয়ং উপস্থিত হন। সীতা দেবী তাঁর স্মৃতিগ্রন্থে লিখেছেন, গেটে হঠাৎ করতালি শুনে তাঁরা বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে দেখেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং সভাস্থলে প্রবেশ করছেন। সুকুমারকে তিনি এতটাই ভালোবাসতেন যে জমিদারি ফেলে কলকাতায় ছুটে এসেছিলেন।বিয়ের পর সুপ্রভাকে নিয়ে সুকুমার পৌঁছান মেঘালয়ের শিলং পাহাড়ে, যেখানে তাঁর ছোটকাকা প্রমদারঞ্জন রায় তাঁর স্ত্রী সুরমা ও কন্যা লীলাকে নিয়ে বাস করতেন। লীলা মজুমদার সেখানেই প্রথম দেখেছিলেন তাঁর বড়দাকে। তাঁর স্মৃতিভাষ্য:“লম্বা দোহারা মানুষটি। একমাথা কালো কোঁকড়া চুল। চোখ দুটি প্রায় সব সময় হাসত। কিন্তু গম্ভীর হলে এমন গম্ভীর হত যে কাছে যেতে ঘেঁষতে ভয় পেতাম। বড়দা ছিল যেমন আমুদে তেমনি রাশভারী। অন্যায় সে কখনো সইত না। যতদূর মনে পড়ে বড়দার বাঁ-গালে একটা বড় তিল ছিল, আমাদের সেটিকে ভারি পছন্দ ছিল।”আর নতুন বৌঠান সুপ্রভাকে দেখে কিশোরী লীলার মুগ্ধ বিস্ময়:“তখন বিকেল বেলা। পড়ন্ত রোদে বৌঠানকে বড় সুন্দর দেখাচ্ছিল। পরনে ঢাকাই শাড়ি। গলায় লম্বা মটরমালা, শ্যামলা রঙের উপর অমন সুন্দর মুখ কখনো দেখেছি বলে মনে পড়ে না।” শান্তিনিকেতনের রঙ্গরসিকতা: ‘বাঙাল সভা’ ও ‘হৈ হৈ সঙ্ঘ’শান্তিনিকেতনে একবার সুকুমারের উপস্থিতিতে এক কৌতুকপূর্ণ সভার আয়োজন হয়েছিল, যার নাম ‘বাঙাল সভা’। সীতা দেবীর বিবরণে জানা যায়, মাঠে তক্তপোশ ও শতরঞ্চি পেতে বসা সেই সভায় রবীন্দ্রনাথ রসিকতা করে প্রস্তাব করেছিলেন যে, সুকুমার রায়ের চেয়ে তাঁর পত্নী সুপ্রভা দেবীকেই সভানেত্রী করা হোক—কারণ কলকাতায় আজন্ম বাস করে সুকুমারের বাঙালত্ব কিছুটা ক্ষয়ে গেছে! তবে সুপ্রভা সম্মত না হওয়ায় সুকুমারকেই সভাপতি করা হয়। সভার নিয়ম ছিল সবাইকে খাঁটি বাঙাল ভাষায় কথা বলতে হবে। চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাধ্য হয়ে তাঁর মামার বাড়ির মালদহের ভাষায় বলতে হয়েছিল। সভাপতি সুকুমার যখন রবীন্দ্রনাথকেও কিছু বলতে অনুরোধ করেন, রবীন্দ্রনাথ অসম্মতি জানিয়ে বলেছিলেন, তিনি খুলনার ভাষায় মাত্র দুটি কথা জানেন, যা দিয়ে আর যা-ই হোক দীর্ঘ বক্তৃতা চলে না; কথা দুটি হলো—‘কুলির অম্বল ও মুগির ডাল’!শান্তিনিকেতনের উন্মুক্ত জীবনের আর এক সৃষ্টি ছিল ‘হৈ হৈ সঙ্ঘ’। এই আসরে গাইবার জন্যই সুকুমারের বিখ্যাত হাস্যরসাত্মক কবিতা ‘গান জুড়েছেন গ্রীষ্মকালে ভীষ্মলোচন শর্মা’-তে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ সুরারোপ করেছিলেন। সুকুমার ও তাঁর স্ত্রী সুপ্রভা উভয়েই ছিলেন রবীন্দ্রনাথের গভীর স্নেহের পাত্র। বিমলাংশুপ্রকাশ রায় লিখেছেন, একবার সুকুমারকে সামনে পেয়ে রবীন্দ্রনাথ হেসে বলেছিলেন, “সুকুমার তুমি যে লিখেছ, ‘ভাব এক্কে ভাব, ভাব দুগুণে ধোঁয়া / তিন ভাবে ডিসপেপসিয়া ঢেকুর উঠবে চোঁয়া’—আমাকে উদ্দেশ্য করে লিখেছ কি?”১৯২১ সালের পূজার ছুটিতে সুপ্রভা রায়ের গানের খাতায় রবীন্দ্রনাথ নিজের হাতে লিখে দিয়েছিলেন একাধিক গান—‘দিন অবসান হল’, ‘আমার দোসর যে জন’, ‘আকাশে আজ কোন চরণের আসা যাওয়া’। সেই খাতায় কবির স্বহস্তে লেখা শেষ রবীন্দ্রসংগীত ছিল ‘সকাল বেলার বাদল আঁধারে’ (২০ জ্যৈষ্ঠ ১৩২৯)। ১৯২১ সালের ২ মে সুকুমার-সুপ্রভার কোল আলো করে জন্ম নেয় তাঁদের একমাত্র সন্তান সত্যজিৎ। মাত্র চার মাস বয়সে পিতৃদোষে অসুস্থ হওয়ার আগে সত্যজিৎ বাবা-মায়ের সঙ্গে শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলেন।বাবার সান্নিধ্য খুব বেশি দিন পাননি সত্যজিৎ। ‘যখন ছোট ছিলাম’ গ্রন্থে তিনি লিখেছেন:“আমার বাবা যখন মারা যান তখন আমার বয়স আড়াই বছর। সে ঘটনা আমার মনে নেই। কিন্তু বাবা যখন অসুস্থ, এবং আমার বয়স দুই কিম্বা আরও কম তখনকার দুটো ঘটনা আমার পরিষ্কার মনে আছে। বাবা অসুখে পড়েন আমি জন্মাবার কিছুদিনের মধ্যেই। এ অসুখ আর সারে নি, তবে মাঝে মাঝে একটু সুস্থ বোধ করলে বাবাকে বাইরে চেঞ্জে নিয়ে যাওয়া হত। বাবার সঙ্গেই আমি গিয়েছিলাম একবার সোদপুর আর একবার গিরিডি। গঙ্গার উপর সোদপুরের বাড়ির উঠোনটা আমার মনে আছে। একদিন বাবা ছবি আঁকছেন, ঘরে জানালার ধারে বসে, এমন সময় হঠাৎ বললেন, ‘জাহাজ যাচ্ছে।’ আমি দৌড়ে উঠোনে বেরিয়ে এসে দেখলাম একটা স্টীমার চলে গেল।” ‘সন্দেশ’ পত্রিকা ও সুকুমারের সাহিত্যবৈভব১৯১৩ সালের মে মাসে (বৈশাখ ১৩২০) উপেন্দ্রকিশোরের হাত ধরে যখন ছোটদের মাসিক পত্রিকা ‘সন্দেশ’ ভূমিষ্ঠ হয়, সুকুমার তখন লন্ডনে। দেশে ফিরেই তিনি পত্রিকার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে পড়েন। ১৯১৫ সালের ডিসেম্বরে মাত্র বাহান্ন বছর বয়সে উপেন্দ্রকিশোরের অকালপ্রয়াণ ঘটলে সম্পাদনার গুরুদায়িত্ব এসে পড়ে জ্যেষ্ঠ পুত্র সুকুমারের কাঁধে।প্রথম পর্যায়ের বারো বছরের ‘সন্দেশ’-এর আট বছরই সম্পাদক ছিলেন সুকুমার। তাঁর শেষ আড়াই বছর রোগশয্যায় কাটলেও বিছানায় শুয়েই তিনি পত্রিকার জন্য লিখেছেন, এঁকেছেন এবং প্রুফ দেখেছেন। কোনো কোনো সংখ্যায় তাঁর নিজেরই সাত-আটটি লেখা বের হতো। ‘সন্দেশ’ ছিল যেন রায় পরিবারের যৌথ সৃজনমেলা। মেজভাই সুবিনয় রায় লিখতেন ধাঁধা ও হেঁয়ালি, ছোটভাই সুবিমল ও বোন শান্তিলতা লিখতেন গল্প, বড়দিদি সুখলতা ও মেজদিদি পুণ্যলতা পাঠাতেন কবিতা। কাকা কুলদারঞ্জন রায় ছোটদের কাছে অমর হয়ে আছেন ‘রবিনহুড’ কাহিনী উপহার দিয়ে; ছোটকাকা প্রমদারঞ্জন রায় সার্ভে অব ইন্ডিয়ার দুর্গম সার্ভে অভিযানের বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখতেন রোমাঞ্চকর ‘বনের খবর’। লীলা মজুমদারও এই পত্রিকাতেই প্রথম হাত পাকান।তবে ‘সন্দেশ’ কেবল পারিবারিক মুখপত্র হয়ে থাকেনি। সুকুমারের আহ্বানে এতে কলম ধরেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, অতুলপ্রসাদ সেন, প্রিয়ম্বদা দেবী, কামিনী রায়, শিবনাথ শাস্ত্রী, খগেন্দ্রনাথ মিত্র, সুনির্মল বসু প্রমুখ দিকপাল সাহিত্যিকেরা।‘সন্দেশ’ সম্পাদনার আগে সুকুমারের দুটি পূর্ণাঙ্গ নাটক ‘শব্দকল্পদ্রুম’ ও ‘চলচ্চিত্তচঞ্চরী’ প্রকাশিত হয়েছিল ‘প্রবাসী’ পত্রিকায়। এগুলো ছিল প্রখর বৌদ্ধিক ব্যঙ্গ ও শাণিত সংলাপে সমৃদ্ধ। ‘সন্দেশ’-এ সুকুমারের প্রথম কাজ ছিল বিলেত থেকে পাঠানো কেদারনাথ চট্টোপাধ্যায়ের গল্প ‘ভবম হাজাম’-এর চিত্রাঙ্কন। কবির হাতে লন্ডনেই প্রথম ‘সন্দেশ’ তুলে দিয়েছিলেন সুকুমার, যা দেখে রবীন্দ্রনাথ নিয়মিত লেখার অঙ্গীকার করেছিলেন।সুকুমারের আট বছর বয়সে প্রথম কবিতা ‘নদী’ প্রকাশিত হয়েছিল ‘মুকুল’ পত্রিকার ১৩০২ জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায়। পরের বছর প্রকাশিত হয় ইংরেজি ছড়া Hickory Dickory Dock-এর ভাবানুবাদ ‘টিক-টিক-টং’। ‘সন্দেশ’-এ তাঁর প্রথম দিককার কবিতা ছিল ‘বেজায় রাগ’ ও ‘খোকা ঘুমায়’। কিন্তু ১৩২১ বঙ্গাব্দের মাঘ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘খিচুড়ি’ কবিতার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য প্রথম প্রত্যক্ষ করল এক সম্পূর্ণ নতুন নান্দনিক ধারা—“হাঁস ছিল সজারু, (ব্যাকরণ মানি না)হয়ে গেল হাঁসজারু কেমনে তা জানি না।”কবিতার সঙ্গে সুকুমার এঁকেছিলেন হাঁসজারু, বকচ্ছপ, হাতিমি, সিংহরিণ, বিছাগল ও গিরিগিটিয়ার মতো আশ্চর্য সব সন্ধিযুক্ত কল্পিত প্রাণীর ছবি।‘আবোল তাবোল’ গ্রন্থের বিখ্যাত কবিতাগুলো প্রথমে ভিন্ন নামে ‘সন্দেশ’-এ প্রকাশিত হয়েছিল। যেমন ‘বাবুরাম সাপুড়ে’ বেরিয়েছিল ‘বাপরে’ নামে, ‘রামগরুড়ের ছানা’ বেরিয়েছিল ‘হেঁস না!’ নামে এবং ‘নোটবই’ বেরিয়েছিল ‘জিজ্ঞাসু’ নামে। জীবদ্দশায় ‘সন্দেশ’-এ ছাপা হয়েছিল তাঁর নাটক ‘অবাক জলপান’, ‘হিংসুটে’ ও ‘মামা গো’। আর মৃত্যুর পরে ছাপা হয় ‘ঝালাপালা’ ও ‘লক্ষণের শক্তিশেল’।বাংলা সাহিত্যের অবিসংবাদিত ননসেন্স ক্লাসিক ‘হ-য-ব-র-ল’ ১৩২৯-এর জ্যৈষ্ঠ থেকে কার্তিক পর্যন্ত চার কিস্তিতে প্রকাশিত হয়। ২০টি দুধর্ষ গল্পের সমাহারে গড়ে ওঠা ‘পাগলা দাশু’, অনবদ্য সায়েন্স ফ্যান্টাসি ‘হেঁশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি’ (যা সত্যজিতের প্রফেসর শঙ্কুর সরাসরি পূর্বসূরি)—সবই ছোটদের হাতে এসেছিল এই ‘সন্দেশ’-এর মাধ্যমে।সুকুমারের মৃত্যুর মাত্র নয় দিন পর, ১৯২৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর গ্রন্থাকারে বের হয় ‘আবোল তাবোল’। মৃত্যুর বহু বছর পর ১৯৪০ সালের ২২ নভেম্বর এম. সি. সরকার অ্যান্ড সন্স থেকে প্রকাশিত হয় ‘পাগলা দাশু’। সুপ্রভা রায়ের অনুরোধে কালিম্পং থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বইয়ের জন্য এক ঐতিহাসিক ভূমিকা লিখে দেন:“সুকুমারের লেখনী থেকে যে অবিমিশ্র হাস্যরসের উৎসধারা বাংলা সাহিত্যকে অভিষিক্ত করেছে তা অতুলনীয়। তাঁর সুনিপুণ ছন্দের বিচিত্র ও স্বচ্ছন্দ গতি, তাঁর ভাব সমাবেশের অভাবনীয় অসংলগ্নতা পদে পদে চমৎকৃতি আনে। তাঁর স্বভাবের মধ্যে বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতির গাম্ভীর্য ছিল, সেই জন্যই তিনি তাঁর বৈপরীত্য এমন খেলাচ্ছলে দেখাতে পেরেছিলেন। বঙ্গসাহিত্যে ব্যঙ্গ রসিকতার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত আরো কয়েকটি দেখা গিয়েছে কিন্তু সুকুমারের অজস্র হাস্যোচ্ছ্বাসের বিশেষত্ব তাঁর প্রতিভার যে স্বকীয়তার পরিচয় দিয়েছে তার ঠিক সমশ্রেণীর রচনা দেখা যায় না। তাঁর এই বিশুদ্ধ হাসির দানের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর অকাল মৃত্যুর সকরুণতা পাঠকদের মনে চিরকালের জন্য জড়িত হয়ে রইল।”‘সন্দেশ’-এর ১৩২৩ অগ্রহায়ণ সংখ্যায় প্রকাশিত সুকুমারের ‘দ্রিঘাংচু’ গল্পটিকে সত্যজিৎ রায় তাঁর পিতার শ্রেষ্ঠ গল্প বলে অভিহিত করেছেন। রাজসভায় একটি দাঁড়কাকের অবিচল ‘কঃ’ ডাক এবং রাজাকে দিয়ে ছাদের ওপর বলানো সেই পরাবাস্তব মন্ত্র—“হলদে সবুজ ওরাং ওটাংইঁট পাটকেল চিৎ পটাংগন্ধ গোকুল হিজিবিজিনো অ্যাডমিশন ভেরি বিজি...”বাংলা সাহিত্যে এমন বিশুদ্ধ ননসেন্সের দৃষ্টান্ত বিরল। ভাষার ধ্বনি ও ব্যঞ্জনার অন্তর্নিহিত রূপ নিয়ে সুকুমার কতটা সজাগ ছিলেন, তা বোঝা যায় ‘প্রবাসী’তে প্রকাশিত তাঁর ‘ভাষার অত্যাচার’ প্রবন্ধ এবং ‘বর্ণমালাতত্ত্ব’ কবিতাটিতে:“অকূল আঁধারে কুহকপাথারে কে আমি একেলা কবিহেরি একাকার সকল আকার সকলি আপন ছবি।কহে, কই কে গো, কোথায় কবে গো, কেন বা কাহারে ডাকি?কহে কহ-কহ, কেন অহরহ, কালের কবলে থাকি?কহে কানে কানে করুণ কুজনে কলকল কত ভাষে,কহে কোলাহলে কলহ কুহরে কাষ্ঠ কঠোর হাসে।”উপেন্দ্রকিশোরের হাত থেকে সুকুমারের হাতে এসে ‘সন্দেশ’ কেবল শিশুদের কাগজ থাকেনি, তা হয়ে উঠেছিল কিশোরদের মনের খোরাক। পিতা ও পুত্রের অঙ্কনরীতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সত্যজিৎ রায় লিখেছিলেন, প্রাতিষ্ঠানিক ড্রয়িংয়ের ব্যাকরণকে অতিক্রম করে সুকুমার জয়ী হয়েছিলেন দুটি দুর্লভ গুণের জোরে—তাঁর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ শক্তি এবং অফুরন্ত কল্পনার অবাধ প্রাচুর্য। পৌরাণিক ও রূপকথার অনুবাদে উপেন্দ্রকিশোর কিংবা কুলদারঞ্জনের যে স্বাভাবিক দখল ছিল, সমালোচকদের মতে সুকুমার সেখানে ততটা সাবলীল ছিলেন না; তবে ‘খৃষ্টবাহন’ ও ‘ভাঙাতারা’ গল্পে তিনি স্বকীয়তার উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে গেছেন।বিজ্ঞানচেতনা ও শেষ দিনগুলির মহাপ্রয়াণ ‘সন্দেশে’ সুকুমার রায়ের আর একটি অসামান্য অবদান ছিল তাঁর বিজ্ঞানবিষয়ক নিবন্ধসমূহ। তিনি বিশ্বাস করতেন, কৌতূহল ও যুক্তি ছাড়া শিশুর মানসিক বিকাশ অসম্পূর্ণ। প্রেসিডেন্সির ডাবল অনার্স ও বিলেতের প্রযুক্তিশিক্ষার ভিত নিয়ে তিনি ছোটদের জন্য ভূবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, প্রাগৈতিহাসিক যুগের ডাইনোসর ও অতিকায় প্রাণী, মাধ্যাকর্ষণ এবং আধুনিক পদার্থবিদ্যার দুরূহ তত্ত্বগুলোকে চটুল, প্রাঞ্জল ও আকর্ষণীয় গদ্যে তুলে ধরেছিলেন। ডারউইন, নিউটন, গ্যালিলিও কিংবা আর্কিমিডিসের মতো বিজ্ঞানীদের জীবন ও আবিষ্কারের গল্প তিনি এমনভাবে পরিবেশন করতেন, যাতে কিশোর পাঠকদের চোখে বিজ্ঞানের জটিল সমীকরণও রূপকথার মতো রোমাঞ্চকর হয়ে উঠত।কিন্তু এই সৃষ্টিশীল প্রাণের পরমায়ু নিয়তি বেঁধে দিয়েছিল বড় নির্দয়ভাবে। ১৯২১ সালে, যখন তাঁর বয়স মাত্র চৌত্রিশ, সুকুমার রায় আক্রান্ত হন মারাত্মক কালাজ্বরে (Leishmaniasis)। তখনো কালাজ্বরের কোনো সুনির্দিষ্ট ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি। একটানা আড়াই বছর তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন তীব্র জ্বর ও শারীরিক ক্ষয় নিয়ে। কিন্তু রোগের সেই তীব্র যন্ত্রণা ও নিশ্চিত মৃত্যুর ছায়াও তাঁর মনের রসপ্রাচুর্য ও অমলিন হাসিকে ম্লান করতে পারেনি। বিছানায় আধশোয়া হয়ে শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ‘আবোল তাবোল’-এর জন্য ছবি এঁকেছেন, ব্লকের প্রুফ দেখেছেন। মৃত্যু যখন দরজায় কড়া নাড়ছে, তখন তিনি লিখেছিলেন তাঁর অন্তিম কবিতা—“আদিম কালের চাদিম যুগেঘ্যাঁঘো বোলের ঠ্যাঁগো মুখে[...]ঘনিয়ে এল ঘুমের ঘোর,গানের পালা সাঙ্গ মোর—‘বিদায়’ তবে...”মৃত্যুর মাত্র কয়েক দিন আগে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং এসেছিলেন ১০০ নম্বর গড়পাড় রোডের বাড়িতে প্রিয় সুকুমারকে শেষ দেখা দেখতে। শয্যাপাশে বসে সুকুমারের অনুরোধে কবি গেয়ে শুনিয়েছিলেন তাঁর গভীর আধ্যাত্মিক গান: “দুখের বেশে এসেছ বলে তোমারে নাহি ডরিব হে...”।১৯২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে চিরবিদায় নেন বাংলা সাহিত্যের এই বিস্ময়কর প্রতিভা। সুকুমার রায় বেঁচে ছিলেন মাত্র সাড়ে তিন দশক, কিন্তু এই সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি বাংলা ভাষার কল্পনার পরিসীমাকে যে উচ্চতায় পৌঁছে দিয়ে গেছেন, শতবর্ষ পেরিয়ে আজ তাঁর ১৩৯তম জন্মবার্ষিকীতেও তা অম্লান, দীপ্ত ও চিরনবীন।