প্রিন্ট এর তারিখ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬
চট্টগ্রামের সিআরবি রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতাল: স্বল্প খরচে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার এক অনন্য দৃষ্টান্ত
অভিলাষ মাহমুদ, সাব-এডিটর ||
বন্দরনগরী চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহাসিক সিআরবি (Central Railway Building) এলাকাটি তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সবুজ পাহাড় এবং ছিমছাম পরিবেশের জন্য বরাবরই নগরবাসীর কাছে বিশেষভাবে পরিচিত। এই মনোরম পরিবেশের মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশ রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতাল বর্তমানে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার একটি অন্যতম প্রধান ভরসার কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছে। চিকিৎসা খাতের আকাশচুম্বী ব্যয়ের যুগে এই হাসপাতালটি যেন নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য এক স্বস্তির সুবাতাস বয়ে এনেছে। মাত্র ১০ টাকার একটি সামান্য টিকিটে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ এবং তার সাথে প্রায় ১২০ টাকার সমপরিমাণ ফ্রি ওষুধ পাওয়ার সুযোগ—স্বাস্থ্যসেবা খাতের এক যুগান্তকারী ও অনুকরণীয় উদাহরণ।সেবা খাতের পরিধি ও ঐতিহাসিক পটভূমিদীর্ঘ সময় ধরে সিআরবির এই হাসপাতালটি মূলত শুধু রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট ছিল। তবে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সাশ্রয়ী মূল্যে আধুনিক ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার অংশ হিসেবে এই সরকারি হাসপাতালটি এখন সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। ফলে পাহাড়ঘেরা এই জনপদের সাধারণ মানুষ অত্যন্ত কম খরচে বড়মাপের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, যা তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে এবং চিকিৎসাব্যয় কমাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।ভিড় ও ভোগান্তিহীন পরিপাটি পরিবেশসাধারণত দেশের যেকোনো সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলেই রোগীদের দীর্ঘ লাইন, দালালের দৌরাত্ম্য, হুড়োহুড়ি এবং চরম ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু সিআরবির রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতালের চিত্রটি সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে পা রাখলেই চোখে পড়বে এক শৃঙ্খলাবদ্ধ ও পরিপাটি পরিবেশ। হাসপাতালের ওয়ার্ড থেকে শুরু করে করিডোর—সব জায়गাতেই পরিচ্ছন্নতার এক চমৎকার ছাপ রয়েছে। কর্তৃপক্ষের কঠোর তদারকি এবং সেবামূলক মানসিকতার কারণে এখানে আগত রোগীরা কোনো ধরনের অতিরিক্ত ভিড় বা বিশৃঙ্খলার শিকার হন না। সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে প্রতিটি রোগীকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে সেবা প্রদান করা হয়, যা রোগীদের মানসিক শান্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের উপস্থিতি ও চিকিৎসাসেবামাত্র ১০ টাকার সামান্য টিকিটে সাধারণ মানুষ এখানে মেডিসিন, শিশু, চর্ম ও যৌন, সার্জারি, ইউরোলজি-সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের (যেমন সহকারী অধ্যাপক ও কনসালট্যান্ট পদমর্যাদার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক) সরাসরি পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। জরুরি ও সাধারণ চিকিৎসাসেবা প্রত্যাশীরা অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে টিকিট সংগ্রহ করে সরাসরি চিকিৎসকের কাছে গিয়ে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে পারছেন। এর পাশাপাশি হাসপাতালের নিজস্ব ইনডোর ও আউটডোর সেবা দিন দিন আরও যুগোপযোগী করা হচ্ছে। প্রিমিয়াম মানের সেবা ও নামমাত্র মূল্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষাবেসরকারি ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে সাধারণ একটি পরীক্ষা করাতে যেখানে হাজার হাজার টাকা খরচ হয়, সেখানে এই সরকারি হাসপাতালে নামমাত্র মূল্যে সব ধরনের শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করার সুব্যবস্থা রয়েছে। হাসপাতালের ভেতরের ল্যাবরেটরিগুলো আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ। রক্ত পরীক্ষা, এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাম থেকে শুরু করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্যাথলজিক্যাল টেস্ট অত্যন্ত নির্ভুল ও দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করা হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগুলো একই ছাদের নিচে সাশ্রয়ী মূল্যে সম্পন্ন করতে পারার কারণে সাধারণ রোগীরা অর্থনৈতিকভাবে মারাত্মক স্বস্তি পাচ্ছেন।হয়রানিমুক্ত সেবা ও বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণযেকোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের সেবার মান নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানা নেতিবাচক ধারণা থাকে। তবে রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতাল সেই ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। এখানে সেবা নিতে আসা রোগীদের কোনো ধরনের জটিলতা বা হয়রানির মুখে পড়তে হয় না। এন্ট্রি কাউন্টার থেকে শুরু করে চিকিৎসকের রুম পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নিয়মতান্ত্রিক ও সহজ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণের পর হাসপাতাল থেকেই বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ (প্রায় ১২০ টাকার ওষুধ) সংগ্রহ করতে পারছেন রোগীরা। চটজলদি এবং সহজে সেবা পাওয়ার কারণে স্থানীয় বাসিন্দা ও দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীদের মাঝে হাসপাতালটির সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে ব্যাপক সন্তোষ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে দেখা গেছে।উপসংহারচট্টগ্রামের সিআরবি রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতাল প্রমাণ করে দিয়েছে যে সদিচ্ছা এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে সরকারি হাসপাতালেও বেসরকারি খাতের চেয়েও উন্নত ও মানসম্মত সেবা দেওয়া সম্ভব। ১০ টাকার টিকিট আর ১২০ টাকার ফ্রি ওষুধের এই কল্যাণমুখী উদ্যোগ দেশের অন্যান্য সরকারি হাসপাতালের জন্য একটি চমৎকার মডেল হতে পারে। নগরবাসীর দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার এই অপ্রতিরোধ্য যাত্রা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে এবং সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে এই প্রতিষ্ঠানটি আরও বহুদূর এগিয়ে যাবে—এমনটাই সকলের প্রত্যাশা।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল