প্রিন্ট এর তারিখ : ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৫ অক্টোবর ২০২৬
দ্বিতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ের ৮ পৃষ্ঠাতেই ২৩টি নৌকার ছবি, পাঠ্যবইয়ে প্রতীক ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক
শিক্ষা ডেক্স ||
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকারের চালু করা নতুন শিক্ষাক্রম বাদ দিয়ে ২০১২ সালের পুরোনো শিক্ষাক্রমে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই পরিমার্জন করা হয় এবং আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বইয়ে ইতিহাসসহ বিভিন্ন বিষয়বস্তুতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হচ্ছে। নতুন বইগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর, বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী, ৭ নভেম্বরের ঘটনা, নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ‘নতুন কুঁড়ি’ আয়োজনের ইতিহাস যুক্ত হচ্ছে। এছাড়া চতুর্থ শ্রেণিতে ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ও ‘খেলাধুলা’ নামে দুটি নতুন বই এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের বইসহ প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম-দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপানো হচ্ছে, যার সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা। তবে এর মধ্যেই প্রাথমিকের পাঠ্যবইয়ের প্রচ্ছদ থেকে শুরু করে ভেতরের বিভিন্ন পাতায় নিষিদ্ধ রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে পরিচিত নৌকার ছবির ‘অতিরঞ্জিত ও অপ্রাসঙ্গিক’ উপস্থিতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বই বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বইগুলোতে মোট ৩৫টি পৃষ্ঠায় ৮৮টিরও বেশি নৌকার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণির বাংলা বইয়ের ১০টি পৃষ্ঠায় মোট ৩২টি নৌকার ছবি রয়েছে; যার মধ্যে ‘ছ’ অক্ষরের ব্যবহারে ‘ছই’ বোঝাতে, এ-কার ও ঐ-কারের ব্যবহারে বৈঠার সাথে, ৪৭ ও ৪৮ পৃষ্ঠায় আষাঢ় মাসের বর্ণনায় নদীতে, ৫৪ পৃষ্ঠায় মেঘ-শৈবাল-ভোর ও নৌকার বাক্যে, ৬০ পৃষ্ঠায় কবি কাজী নজরুলের ‘ভোর হলো’ কবিতায় এবং ইনার ও ৬৯ পৃষ্ঠায় হুবহু পুনরাবৃত্তিসহ অহেতুক নৌকার ছবি রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ের ৮টি পৃষ্ঠায় ২৩টি ছবি রয়েছে, যার কাভার পেজে এবং শীতকালের ভরাট নদীর ছবিতে নৌকা দেখানো হয়েছে। তৃতীয় শ্রেণির বইয়ের ৯টি পৃষ্ঠায় ২৫টি নৌকার ছবি রয়েছে, যার কাভার পেজের পাশাপাশি ৩২ পৃষ্ঠায় ‘মাঝি’ শব্দ বোঝাতে এবং ৩৪ পৃষ্ঠায় রাজুর আঁকা ছবির অংশে তিনটি নৌকা আছে। চতুর্থ শ্রেণির বাংলা বইয়ের ৩টি পৃষ্ঠায় (সত্যােন্দ্রনাথ দত্তের ‘দূরের পাল্লা’ কবিতা, ৪৬ পৃষ্ঠার অনুচ্ছেদ লেখার ছবি এবং ১০২ পৃষ্ঠায় রবীন্দ্রনাথের ‘ইচ্ছামতী’ কবিতায়) এবং পঞ্চম শ্রেণির বইয়ে মোট ৫টি পৃষ্ঠায় (ইনার কাভার ও ভেতরের একাধিক পাতা এবং হাঁটু সমান পানিতে বসানো নৌকা) নৌকার অতিরঞ্জিত ব্যবহার রয়েছে। অন্যদিকে, দ্বিতীয় শ্রেণির ইংরেজি বই ‘English for Today’-এর ৬, ৭, ৮ ও ১১ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘B for Boat’ শব্দ ও নৌকার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে A থেকে E পর্যন্ত শব্দ গঠনে A-তে Ant, C-তে Crow, D-তে Deer এবং E-তে Ear-এর প্রতীক হিসেবে হাতির ছবি ব্যবহার করা হলেও ব্যতিক্রম কেবল B-তে Boat (যা প্রাণী নয়)। এমনকি ৮ নম্বর পৃষ্ঠার একটি ছবিতে নৌকার ওপর দুটি হরিণ দাঁড়িয়ে থাকতে এবং তীরে থাকা হাতি শুঁড় দিয়ে নৌকা টেনে ধরার মতো একটি অস্বাভাবিক ও অপ্রাসঙ্গিক দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০ অক্টোবর পর্যন্ত প্রাথমিক স্তরের ৮৬ শতাংশের বেশি বই ছাপার কাজ শেষ হয়েছে এবং বাঁধাই, কাটিং ও পিডিআই শেষে ৭৪ শতাংশ বই সরবরাহ করা হয়েছে। এই বিতর্ক ও সমালোচনার প্রেক্ষিতে এনসিটিবি একটি কমিটি গঠন করলেও প্রাথমিকের শিক্ষাক্রমের সদস্য প্রফেসর ড. মো. ইকবাল হায়দার প্রতীক ব্যবহারের সংখ্যা বা বই বাতিলের গুঞ্জন সম্পর্কে নিজের অজ্ঞতা প্রকাশ করে পুরো বিষয়টি লেখকদের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী জানিয়েছেন, বইগুলো পর্যালোচনা করে সভা করা হবে এবং মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও লেখক-সম্পাদক তারিক মনজুর মন্তব্য করেছেন যে, নদীমাতৃক দেশের প্রকৃতির ছবি আঁকার সময় চিত্রকরদের হাতে নদী-নৌকা বা ধানখেতের ছবি আসা স্বাভাবিক হলেও লেখক-সম্পাদকরা সুনির্দিষ্ট সংখ্যা ভেবে বই করেননি। এদিকে এনসিটিবির আর্টিস্ট-কাম-ডিজাইনার সুদর্শন বাছার জানিয়েছেন যে গ্রাফিক্স ডিজাইন তারা করেননি, বরং ফ্রিলান্সারদের মাধ্যমে এটি করা হয়েছে এবং এর নির্দেশনা দিয়েছিল এনসিটিবির প্রাথমিক শাখা।এর আগে ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বইয়ে ‘প্রজ্ঞা’ বোঝাতে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী প্রতীক দাঁড়িপাল্লা ব্যবহারের অভিযোগে প্রায় ২০ লাখ ছাপানো বই মাঠপর্যায় থেকে তুলে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল এনসিটিবি। পরিমার্জন কমিটি শুধু ‘বুদ্ধি’র বদলে ‘প্রজ্ঞা’ লেখার সুপারিশ করলেও গ্রাফিকস ডিজাইনাররা গুগলে পুরোনো প্রতীকটি খুঁজে বসিয়ে দেওয়ায় এই অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যয় ও জটিলতা তৈরি হয় বলে জানিয়েছেন এনসিটিবির শিক্ষাক্রম সদস্য অধ্যাপক ড. এ কে এম শওকত আলী খান। পুরো এই পাঠ্যবই বিতর্ক ও মুদ্রণ অব্যবস্থাপনার বিষয়ে জানতে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজকে একাধিকবার কল দিলেও তাদের পাওয়া যায়নি।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল