প্রিন্ট এর তারিখ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬
মৃত্যু নয়, স্মৃতির উদ্যাপন: মেক্সিকোর Day of the Dead
ইসরাত জাহান ||
মনে আছে সেই বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় ও প্রশংসিত অ্যানিমেশন সিনেমা Coco–এর কথা? ২০১৭ সালে মুক্তি পাওয়া পিক্সারের অ্যানিমেশন সিনেমা Coco আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল এক আশ্চর্য জগতের সঙ্গে—যেখানে মৃত্যু মানেই সবকিছুর সমাপ্তি নয়, বরং প্রিয়জনদের স্মৃতির মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকার এক অনন্য গল্প। মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী উৎসব Día de los Muertos, অর্থাৎ Day of the Dead, এই সিনেমার অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা। প্রতি বছর নভেম্বরের ১ ও ২ তারিখে মেক্সিকোর মানুষ তাঁদের প্রয়াত প্রিয়জনদের স্মরণ করেন রঙিন ফুল, মোমবাতি, ছবি, খাবার আর ভালোবাসায় সাজানো বেদির মাধ্যমে। কিন্তু এই উৎসবের পেছনের ইতিহাস কী? কেন মৃত্যুকে ঘিরে এমন রঙিন উদ্যাপন? আর Coco সিনেমার সঙ্গে এই উৎসবের সম্পর্কই বা কতটা গভীর?চলুন, জেনে নেওয়া যাক মেক্সিকোর এই অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গল্প। মৃত্যুকে ঘিরে এত রঙের উৎসব কেন?সাধারণভাবে মৃত্যু আমাদের মনে শোক ও বিচ্ছেদের অনুভূতি জাগায়। কিন্তু মেক্সিকোর এই উৎসব মৃত্যুকে স্মরণ করার পাশাপাশি জীবিতদের সঙ্গে মৃত প্রিয়জনদের স্মৃতির বন্ধনকে উদ্যাপন করে।এই ঐতিহ্যের শিকড় প্রাচীন মেসোআমেরিকান সংস্কৃতিতে রয়েছে। পরবর্তী সময়ে স্প্যানিশ উপনিবেশ ও ক্যাথলিক ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রভাবের মধ্য দিয়ে উৎসবটি বর্তমান রূপ পেয়েছে। মেক্সিকান পরিবারগুলোর বিশ্বাস ও রীতিতে কিছু পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—প্রিয়জনকে ভালোবাসা ও স্মরণ করার জন্য মৃত্যু তাঁদের সম্পর্কের শেষ কথা নয়।Ofrenda: ভালোবাসার স্মৃতিবেদিমেক্সিকোর Day of the Dead উৎসবে অনেক পরিবার প্রয়াত প্রিয়জনদের কবর পরিষ্কার করে কমলা-হলুদ Cempasúchil গাঁদা ফুল ও মোমবাতি দিয়ে সাজান। কিছু অঞ্চলে রাতে ফুল ও মোমবাতির আলোয় কবরস্থানগুলোও আলোকিত হয়ে ওঠে। ঐতিহ্যগত বিশ্বাস অনুযায়ী, গাঁদা ফুলের রং ও সুবাস মৃতদের আত্মাকে পথ দেখায়। তবে এই উৎসব শুধু কবর সাজানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বাড়িতে প্রিয়জনদের ছবি, খাবার, ফুল ও মোমবাতি দিয়ে Ofrenda বা স্মৃতিবেদি সাজানোও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঐতিহ্যগত বিশ্বাসে ফুলের রং ও সুবাস প্রিয়জনদের আত্মাকে পথ দেখায়। তবে এই বিশ্বাস ও বেদি সাজানোর রীতি পরিবার ও অঞ্চলভেদে ভিন্ন হতে পারে। এখানে প্রতিটি জিনিসের পেছনে থাকে কোনো না কোনো স্মৃতি—কেউ হয়তো তাঁর দাদির প্রিয় খাবার রাখেন, কেউ সাজিয়ে রাখেন বাবার ছবি, আবার কেউ ছোট্ট শিশুটির স্মৃতিতে জ্বালান একটি মোমবাতি। এ যেন মৃতদের জন্য সাজানো একটি বেদি নয়, বরং ভালোবাসার স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার একটি উপায়। কঙ্কালের সাজ, রঙিন মুখ আর La Catrinaমেক্সিকোর Day of the Dead উৎসবের কথা মনে এলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রঙিন কঙ্কালের মুখ, ফুলে সাজানো চুল, বাহারি পোশাক আর উৎসবমুখর মানুষের ভিড়। এই বর্ণিল আয়োজনের অন্যতম পরিচিত প্রতীক হলো La Catrina—একজন মার্জিত নারীর কঙ্কাল-অবয়ব, যাঁকে প্রায়ই অভিজাত পোশাক ও বিশাল ফুলের মুকুটে সাজানো অবস্থায় দেখা যায়।তবে La Catrina কেবল উৎসবের সাজসজ্জার একটি অংশ নয়; এর পেছনে রয়েছে শিল্প ও সামাজিক ইতিহাস। মেক্সিকান শিল্পী হোসে গুয়াদালুপে পোসাদার তৈরি কঙ্কালচিত্র থেকে এই প্রতীকের পরিচিতি গড়ে ওঠে। পরবর্তীকালে শিল্পী দিয়েগো রিভেরার কাজের মাধ্যমে La Catrina আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এই কঙ্কালচিত্রের মধ্য দিয়ে মানুষের বাহ্যিক আড়ম্বর, সামাজিক মর্যাদা এবং শ্রেণিগত পার্থক্য নিয়ে ব্যঙ্গও প্রকাশ পেয়েছিল।উৎসবে কঙ্কালের মুখে রং করা কিংবা কঙ্কালের পোশাক পরার দৃশ্য দেখে একে অনেক সময় ভৌতিক আয়োজন বলে মনে হতে পারে। কিন্তু Day of the Dead-এর সাংস্কৃতিক তাৎপর্য আরও গভীর। এখানে কঙ্কাল শুধু মৃত্যুর প্রতীক নয়; এটি মানুষকে জীবনের অনিবার্য পরিণতির কথা মনে করিয়ে দেয়। বাহ্যিক সৌন্দর্য, সম্পদ কিংবা সামাজিক অবস্থান—সবকিছুর ঊর্ধ্বে মানুষে মানুষে সম্পর্ক, স্মৃতি ও ভালোবাসার গুরুত্বই যেন এই প্রতীকের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে।মৃত্যুকে ভয়ের চোখে দেখার পরিবর্তে, জীবনেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করা এবং প্রিয়জনদের স্মৃতিকে ভালোবাসায় বাঁচিয়ে রাখা—এই ভাবনাই উৎসবটির রঙিন কঙ্কালচিত্রগুলোকে বিশেষ তাৎপর্য দেয়। উৎসবের খাবারেও রয়েছে স্মৃতির ছোঁয়াএই উৎসবের আরেকটি আকর্ষণ হলো ঐতিহ্যবাহী খাবার। Pan de muerto নামের মিষ্টি রুটি এ সময় বিশেষভাবে জনপ্রিয়। এর ওপরের সাজসজ্জায় প্রায়ই হাড়ের মতো আকৃতি দেখা যায়। পাশাপাশি থাকে চিনির তৈরি খুলি, ফলমূল, পানীয় এবং পরিবারের সদস্যদের পছন্দের খাবার।এসব খাবার কেবল ভোজের জন্য নয়; এগুলো পরিবারের স্মৃতি, ভালোবাসা এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা ঐতিহ্যেরও অংশ। কোথায় দেখা যায় এই উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় আয়োজন?মেক্সিকোর বিভিন্ন অঞ্চলে Day of the Dead বা Día de los Muertos পালনের রীতিতে রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। দেশটির কোথাও এই উৎসব উদ্যাপিত হয় বিশাল শোভাযাত্রা ও বর্ণিল আয়োজনের মধ্য দিয়ে, আবার কোথাও প্রাধান্য পায় পারিবারিক ঐতিহ্য, প্রার্থনা এবং প্রয়াত প্রিয়জনদের স্মরণ। যেমন, রাজধানী মেক্সিকো সিটিতে এই সময় রাস্তাজুড়ে দেখা যায় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, বিশালাকার কঙ্কালের প্রতিকৃতি, রঙিন পোশাক এবং নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন। অন্যদিকে, ওয়াহাকা (Oaxaca) অঞ্চলে উৎসবটির ঐতিহ্যবাহী রূপ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সেখানে সাজানো হয় স্মৃতিবেদি, আয়োজন করা হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং স্থানীয় রীতিনীতি অনুসরণ করে প্রিয়জনদের স্মরণ করা হয়। আবার পাতসকুয়ারো (Pátzcuaro) ও মিচোয়াকান অঞ্চলের আশপাশে কবরস্থানে মোমবাতি জ্বালানো, ফুল দিয়ে সমাধি সাজানো এবং রাতের নীরব পরিবেশে প্রার্থনা করার ঐতিহ্য বিশেষভাবে পরিচিত। অঞ্চলভেদে এই ভিন্নতা প্রমাণ করে, Day of the Dead কেবল একটি উৎসব নয়; এটি মেক্সিকোর ইতিহাস, স্থানীয় সংস্কৃতি, পারিবারিক বন্ধন এবং মৃত প্রিয়জনদের স্মৃতিকে ঘিরে গড়ে ওঠা এক সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। কেন Coco এত গভীরভাবে হৃদয় ছুঁয়ে যায়?সিনেমাটির সবচেয়ে সুন্দর বার্তাগুলোর একটি হলো, প্রিয়জনকে হারানোর পরও তাঁর স্মৃতি আমাদের জীবনে বেঁচে থাকতে পারে। পরিবারের পুরোনো ছবি, একসঙ্গে কাটানো সময়, প্রিয় গান কিংবা বলা গল্প—এসবের মধ্য দিয়ে মানুষ তার পূর্বপুরুষদের সঙ্গে মানসিক বন্ধন ধরে রাখে।মেক্সিকোর Day of the Dead উৎসবেও পারিবারিক স্মৃতি ও প্রিয়জনদের সম্মান জানানোর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণেই Coco কেবল একটি অ্যানিমেশন সিনেমা হয়ে থাকে না; এটি দর্শকদের সামনে ভিন্ন একটি সংস্কৃতির দরজা খুলে দেয় এবং পরিবার, স্মৃতি ও ভালোবাসার সর্বজনীন অর্থ নিয়ে ভাবতে শেখায়।শেষ পর্যন্ত, Coco আমাদের মনে করিয়ে দেয়—কোনো মানুষকে স্মরণ করা মানে শুধু তাঁর অতীতকে মনে রাখা নয়, বরং তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ভালোবাসা ও গল্পগুলোকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল