প্রিন্ট এর তারিখ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬
মু’তাহ বিবাহ ও হিল্লা বিবাহ: ইসলামী দৃষ্টিকোণ ও আইনি পর্যালোচনা
ইসলামিক ডেক্স ||
ইসলামী পারিবারিক আইন ও সমাজব্যবস্থায় বিবাহ একটি অত্যন্ত পবিত্র ও স্থায়ী বন্ধন। তবে ইতিহাসে এবং বিভিন্ন সমাজে বৈবাহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু বিতর্কিত ও সাময়িক প্রথা দেখা যায়। তার মধ্যে মু’তাহ বিবাহ এবং হিল্লা বিবাহ অন্যতম। ইসলামী শরিয়াহ, ইতিহাস এবং আধুনিক আইনের আলোকে দুটি বিষয়ের স্পষ্ট বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো।১. মু’তাহ বিবাহ (Mut'ah Marriage)ধারণা ও পটভূমি'মুতাহ' একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ 'উপভোগ করা' বা 'সাময়িক সুবিধা নেয়া'। পরিভাষায়, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অর্থ বা নির্দিষ্ট মোহরানার বিনিময়ে যে চুক্তিভিত্তিক বিবাহ সম্পন্ন করা হয়, তাকে মুতাহ বিবাহ বা সাময়িক বিবাহ বলা হয়। এই বিবাহের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা (যেমন: একদিন, এক সপ্তাহ, এক মাস বা কয়েক বছর) আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে এবং মেয়াদ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই কোনো তালাক ছাড়াই বিবাহটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়।ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিইসলামের প্রারম্ভিক যুগ: ইসলামের প্রাথমিক যুগে যুদ্ধের সময় বা দীর্ঘ ভ্রমণের পরিস্থিতিতে পুরুষদের ব্যভিচার থেকে রক্ষার্থে মুতাহ বিবাহের সাময়িক অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।রহিতকরণ (নসখ): অধিকাংশ ইসলামী স্কলার ও নির্ভরযোগ্য হাদিস অনুযায়ী, পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ (সা.) চূড়ান্তভাবে মুতাহ বিবাহকে কিয়ামত পর্যন্তের জন্য হারাম বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত সহীহ হাদিস এবং খাইবার যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ঘোষণা এর প্রধান প্রমাণ।মাজহাবভিত্তিক মতামত:সুন্নি মতবাদ: চার মাজহাবের (হানাফি, মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি) সকল ফকীহ একমত যে মুতাহ বিবাহ সম্পূর্ণ বাতিল (বাতিল নিাকাহ) এবং ব্যভিচারের শামিল।শিয়া (ইমামী/জাফরি) মতবাদ: শিয়া সম্প্রদায়ের একাংশ মুতাহ বিবাহকে বৈধ মনে করে এবং তাদের ধর্মীয় বিধানে এটি স্বীকৃত।২. হিল্লা বিবাহ (Hilla Marriage)ধারণা ও পটভূমি'হিল্লা' শব্দটি এসেছে আরবি 'হালাল' (বৈধ করা) শব্দ থেকে। সাধারণ কথ্য ভাষায়, কোনো স্বামী তার স্ত্রীকে তিন তালাক (তালাকে মুগাল্লাজা বা চূড়ান্ত তালাক) দেওয়ার পর, যদি সেই দম্পতি পুনরায় সংসার করতে চায়—তবে স্ত্রীকে অন্য একজন পুরুষের সাথে বিবাহ দিয়ে, তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করিয়ে, অতঃপর দ্বিতীয় স্বামীর তালাক বা মৃত্যুর পর ইদ্দত পালন শেষে প্রথম স্বামীর সাথে পুনরায় বিবাহ দেওয়াকে প্রচলিত সমাজভাষায় 'হিল্লা বিবাহ' বলা হয়।ইসলামী শরিয়াহর সঠিক বিধানইসলামে তিন তালাকের পর পূর্বের স্বামীর সাথে পুনরায় বিবাহের শর্ত এবং চুক্তিভিত্তিক হিল্লা বিবাহের বিধান সম্পূর্ণ বিপরীত:১. কুরআনের মূল বিধান: কুরআন অনুযায়ী (সূরা বাকারা: ২৩০), তিন তালাকের পর স্ত্রী সম্পূর্ণ স্বাধীন। সে যদি স্বাভাবিক নিয়মে অন্য কোনো পুরুষকে পছন্দ করে এবং কোনো শর্ত ছাড়া বিবাহ করে—অতঃপর কোনো কারণে তাদের স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন ব্যর্থ হয় বা দ্বিতীয় স্বামী মারা যায়, তবে ইদ্দত শেষে সে ইচ্ছে করলে প্রথম স্বামীকে বিবাহ করতে পারে। এটি কোনো পরিকল্পিত বা কৃত্রিম প্রক্রিয়া নয়।২. চুক্তিভিত্তিক হিল্লা বিবাহ নিষিদ্ধ: প্রথম স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে অগ্রিম শর্ত বা চুক্তির মাধ্যমে ১ দিন বা কিছুদিন স্থায়ী বিবাহের আয়োজন করা ইসলামে কঠোরভাবে অভিশাপগ্রস্ত ও নিষিদ্ধ।৩. হাদিসের কঠোর বাণী: রাসূলুল্লাহ (সা.) চুক্তিভিত্তিক হিল্লা বিবাহ পরিচালনাকারী এবং যার জন্য করা হয়—উভয়ের ওপর অভিশাপ প্রদান করেছেন। তিনি চুক্তিভিত্তিক হিল্লা সম্পাদনকারী দ্বিতীয় স্বামীকে "ভাড়ায় চালিত পাঁঠা" বা "ধার করা ষাঁড়" হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।৩. মুতাহ ও হিল্লা বিবাহের তুলনামূলক চিত্রবিষয়মুতাহ বিবাহহিল্লা বিবাহ (প্রচলিত/চুক্তিভিত্তিক)মূল উদ্দেশ্যনির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য যৌন তৃপ্তি বা সাময়িক সাহচর্য।তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে প্রথম স্বামীর জন্য বৈধ (হালাল) করা।সময়সীমাশুরুতেই মেয়াদ (দিন/মাস) নির্দিষ্ট থাকে।সাধারণত ১ দিন বা অতি অল্প সময় পর তালাকের চুক্তি থাকে।শরিয়াহর হুকুমসুন্নি মতে সম্পূর্ণ হারাম ও বাতিল।পরিকল্পিত/চুক্তিভিত্তিক হলে সম্পূর্ণ হারাম ও অভিশাপগ্রস্ত।তালাকের প্রয়োজনীয়তামেয়াদ শেষে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিবাহ বাতিল হয়।দ্বিতীয় স্বামীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তালাক দিতে হয়।৪. আধুনিক আইন ও সামাজিক বাস্তবতাআইনগত দিক থেকে অনেক মুসলিম প্রধান দেশেই এই দুটি প্রথাকে নিরুৎসাহিত ও নিষিদ্ধ করা হয়েছে:বাংলাদেশের আইন: ১৯৭৪ সালের পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ এবং মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ অনুযায়ী, যেকোনো জোরপূর্বক, চুক্তিভিত্তিক বা মর্যাদা হানিকর বিবাহ প্রথা বেআইনি। বাংলাদেশের উচ্চ আদালত সামাজিক কুসংস্কার হিসেবে চুক্তিভিত্তিক হিল্লা বিবাহ এবং এর নামে নারীদের ওপর ঘটে যাওয়া ফতোয়া বা নির্যাতনকে বেআইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ ঘোষণা করেছেন।নারীর অধিকার ও মানবিক দিক: সাময়িক সুবিধার্থে নারীকে ব্যবহার করা বা হিল্লা বিবাহের নামে অন্য পুরুষের সাথে রাত যাপনে বাধ্য করা নারীর চরম অবমাননা। ইসলাম নারীকে পূর্ণ সম্মান ও স্বাধীনতা দিয়েছে, কোনো স্বার্থে ব্যবহারের বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করেনি।উপসংহারসারসংক্ষেপে, মুতাহ বিবাহ হলো নির্দিষ্ট মেয়াদের সাময়িক বিবাহ যা প্রধান সুন্নি ইসলামে চূড়ান্তভাবে নিষিদ্ধ। অন্যদিকে, হিল্লা বিবাহ হলো একটি কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও চুক্তিভিত্তিক নিষিদ্ধ চর্চা, যা ইসলামের পবিত্র বিবাহের বিধানকে বিকৃত করে পরিচালনা করা হয়। সঠিক ধর্মীয় জ্ঞান এবং সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে এই কুপ্রথাগুলো থেকে সমাজকে মুক্ত রাখা অত্যন্ত জরুরি।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল