প্রিন্ট এর তারিখ : ০৭ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৭ অক্টোবর ২০২৬
মেধাতন্ত্রের মুখোমুখি পরিচয়ের রাজনীতি: চূড়ান্ত সুপারিশের পরও বঞ্চনা
আবদুল্লাহ মজুমদার , সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনীতিক ||
গেজেট প্রকাশের দিনটির জন্য কত স্বপ্নই না জমিয়ে রেখেছিলেন রেদওয়ান আহমদ তাহমিদ। দীর্ঘ অপেক্ষার পর সেদিন হয়তো নিজের নামটি খুঁজে পাবেন, স্ত্রীকে নিয়ে আনন্দ করবেন, স্বজনদের জানাবেন—অবশেষে অপেক্ষার অবসান হয়েছে। পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীও সেই আনন্দের মুহূর্তের অংশ হতে ঢাকায় থেকে গিয়েছিলেন। কিন্তু যে দিনে একটি নামের পাশে নতুন ভবিষ্যতের দরজা খুলে যাওয়ার কথা, সেদিনই যেন সব হিসাব উল্টে গেল। গেজেট প্রকাশিত হলো, অথচ সেখানে নেই রেদওয়ানের নাম। অথচ তাঁর দাবি, বিসিএসের প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে তিনি পেয়েছিলেন চূড়ান্ত সুপারিশ। ৪৯তম বিসিএসের চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের পর রেদওয়ানের এই ঘটনা সামনে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের এই শিক্ষার্থী জানান, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) তাঁকে চূড়ান্তভাবে সুপারিশ করেছিল। এরপর প্রায় ১০ মাস তিনি গেজেটের অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত গেজেটে তাঁর নাম পাওয়া যায়নি। প্রথমেই বলা দরকার, রেদওয়ানের অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা এবং তাঁর নাম বাদ পড়ার কারণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তাই অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া যেমন ঠিক হবে না, তেমনি একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ উঠেছে বলে সেটিকে উপেক্ষা করাও সমীচীন নয়। বরং প্রয়োজন স্বচ্ছ ব্যাখ্যা—কেন একজন চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীর নাম শেষ পর্যায়ে গেজেটে থাকল না?রেদওয়ানের চাকরির প্রস্তুতির গল্পটিও কম দীর্ঘ নয়। আগের বছরের জুন থেকে প্রস্তুতি শুরু করে তিনি ব্যাংকের প্রাথমিক ও লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ৪৭তম বিসিএসের প্রিলিমিনারিতেও সফল হন। পরে ৪৯তম বিসিএসকে লক্ষ্য করে প্রস্তুতি নিয়ে লিখিত ও মৌখিক—দুই ধাপেই উত্তীর্ণ হন। সবশেষে পিএসসির চূড়ান্ত সুপারিশ পান।এরপর তাঁর কাছে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয় একটি প্রত্যাশা—চাকরিটি এবার তাঁর।তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই বিশ্বাস থেকেই তিনি ১০-১৫টি সরকারি চাকরির পরীক্ষা ও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া থেকে বিরত ছিলেন। প্রায় ১০ মাসের অপেক্ষায় তিনি ধরে নিয়েছিলেন, চূড়ান্ত সুপারিশের পর তাঁর ভবিষ্যৎ আর অনিশ্চিত নয়।কিন্তু গেজেট প্রকাশের পর দেখা গেল, ‘চূড়ান্ত’ শব্দটির অর্থ তাঁর জন্য এতটা চূড়ান্ত ছিল না।এখানেই মূল প্রশ্ন।রেদওয়ানের দাবি, তাঁর বাবা সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলা জামায়াতের আমির। পুলিশ ভেরিফিকেশনের সময় তাঁর পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। যদি তাঁর নাম বাদ পড়ার পেছনে সত্যিই এমন কোনো বিষয় থাকে, তাহলে সেটি শুধু একজন তরুণের চাকরি না পাওয়ার ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নিয়োগব্যবস্থার ন্যায়সংগততা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।একজন প্রার্থীর যোগ্যতা কি তাঁর নিজের, নাকি পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয়ের দায়ও তাঁকে বহন করতে হবে?পুলিশ ভেরিফিকেশন একটি প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সরকারি পদে নিয়োগের আগে প্রার্থীর পরিচয়, তথ্য ও সংশ্লিষ্ট বিষয় যাচাই করা। নিরাপত্তা বা প্রশাসনিক স্বার্থে কোনো প্রার্থীর বিষয়ে বিরূপ তথ্য পাওয়া গেলে তা অবশ্যই বিবেচনায় আসতে পারে। কিন্তু সেখানে একটি মৌলিক সীমারেখা থাকা দরকার—প্রার্থী এবং তাঁর পরিবারের সদস্য এক ব্যক্তি নন।বাবার রাজনৈতিক পরিচয় সন্তানের অপরাধ নয়। আবার সন্তানের নিজের কোনো অপরাধ বা অসঙ্গতি থাকলে শুধু বাবার পরিচয়ের কারণে সেটি আড়ালও করা যায় না। অর্থাৎ মূল্যায়নের কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে প্রার্থীর নিজের আচরণ, যোগ্যতা ও কর্মকাণ্ড।মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থার সৌন্দর্য এখানেই। একজন প্রার্থী কোথা থেকে এসেছেন, তাঁর বাবা কী করেন, পরিবার কোন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করে—এসবের ঊর্ধ্বে উঠে যদি তাঁর যোগ্যতা যাচাই করা হয়, তবেই নিয়োগব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয়। অন্যদিকে পারিবারিক পরিচয় যদি ব্যক্তির যোগ্যতার ওপর ছায়া ফেলে, তাহলে শুধু একজন প্রার্থী নয়, পুরো ব্যবস্থাটিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।তবে এর অর্থ এই নয় যে পুলিশ ভেরিফিকেশন অপ্রয়োজনীয়। বরং ভেরিফিকেশন আরও নির্ভুল ও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিরূপ তথ্য থাকলে তার ভিত্তি কী, তথ্যটি কতটা নির্ভরযোগ্য, সেটি প্রার্থীর নিজের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত—এসব প্রশ্নের উত্তর থাকা দরকার। একই সঙ্গে একজন চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীর নাম বাদ পড়লে সেই সিদ্ধান্তের কারণও ন্যূনতম পর্যায়ে স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন।রেদওয়ানের ব্যক্তিগত পরিস্থিতি ঘটনাটিকে আরও মানবিক করে তোলে। ঢাকায় একটি এককক্ষের ভাড়া বাসায় থাকা এই তরুণের স্ত্রী পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। গেজেট প্রকাশের দিনটি আনন্দের হবে—এই প্রত্যাশায় স্ত্রীও ঢাকায় থেকে গিয়েছিলেন। দীর্ঘ প্রস্তুতি, পরীক্ষা, অপেক্ষা—সবকিছুর পর একটি নতুন জীবনের শুরু হবে, এমন প্রত্যাশাই ছিল তাঁদের। অথচ সেই প্রত্যাশার জায়গায় এসেছে অনিশ্চয়তা।এখানে তাই প্রশ্নটি শুধু রেদওয়ানের নয়।প্রশ্ন হলো, কোনো প্রার্থী সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর পিএসসির চূড়ান্ত সুপারিশ পেলেন, কিন্তু গেজেটে তাঁর নাম এল না—তাহলে মাঝখানে কী ঘটল? তাঁর বিরুদ্ধে কোনো বিরূপ তথ্য পাওয়া গিয়েছিল কি? পাওয়া গেলে সেটি কী? প্রশাসনিক কোনো কারণে তাঁর নাম বাদ পড়লে সেই কারণ কী? আর যদি পুলিশ ভেরিফিকেশনের কোনো তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেই তথ্য প্রার্থীর নিজের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত?এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া মানে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া নয়। বরং একটি স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থার স্বাভাবিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা।সরকারি চাকরি কোনো নাগরিকের জন্মগত অধিকার নয়। যোগ্যতা, প্রতিযোগিতা ও নির্ধারিত মানদণ্ডের ভিত্তিতেই নিয়োগ হবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একইভাবে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তও ব্যাখ্যাযোগ্য হওয়া দরকার। কারণ নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু ফলাফল নয়, ফলাফলে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াটিও গুরুত্বপূর্ণ।একজন নাগরিক যদি জানেন—তিনি নিজের যোগ্যতায় প্রতিযোগিতা করবেন এবং নিজের কাজের জন্যই মূল্যায়িত হবেন, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি তাঁর আস্থা বাড়বে। বিপরীতে যদি তাঁর মনে হয়, নিজের যোগ্যতার পাশাপাশি তাঁকে পরিবারের পরিচয়ের ভারও বহন করতে হচ্ছে, তাহলে সেই আস্থায় ফাটল ধরবে।রেদওয়ানের নাম গেজেটে কেন নেই, সেটি শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যাতেই পরিষ্কার হওয়া উচিত। তাঁর অভিযোগ সত্য হলে তার প্রতিকার প্রয়োজন; অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে সেটিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। কারণ সত্য গোপন রেখে কোনো নিয়োগব্যবস্থার প্রতি আস্থা তৈরি করা যায় না।একটি গেজেটে একটি নাম না থাকার ঘটনা হয়তো প্রশাসনিক নথিতে ছোট একটি বিষয়। কিন্তু সেই নামটির পেছনে থাকতে পারে বছরের পর বছর পরিশ্রম, পরিবারের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা এবং একটি তরুণ জীবনের মোড় ঘুরে যাওয়ার অপেক্ষা। রেদওয়ানের ক্ষেত্রে সেই অপেক্ষার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও বড় একটি প্রশ্ন—রাষ্ট্র কি একজন মানুষকে তাঁর নিজের যোগ্যতা ও কর্মকাণ্ড দিয়ে বিচার করবে, নাকি তাঁর পরিবারের পরিচয়ও তাঁর ভবিষ্যতের ওপর ছায়া ফেলবে?এই প্রশ্নের উত্তর শুধু রেদওয়ানের প্রয়োজন নয়। প্রয়োজন আমাদের সবার। কারণ একটি নিয়োগব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু কতজনকে চাকরি দেওয়া হলো, তা নয়; বরং যারা সুযোগ পেলেন না, তারাও যেন বিশ্বাস করতে পারেন—সিদ্ধান্তটি ন্যায়সংগত ছিল। চূড়ান্ত সুপারিশ যদি শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত না-ও হয়, অন্তত তার পরিবর্তনের কারণটি যেন অস্বচ্ছ না থাকে। রাষ্ট্রের কাছে একজন নাগরিকের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হয়তো এটুকুই—তাঁকে তাঁর নিজের পরিচয়ে বিচার করা হোক।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল