প্রিন্ট এর তারিখ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সরকারি চাকরিতে রেকর্ড প্রতিযোগিতা, এক পদে ১,৪৩০ প্রার্থী
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
দেশে সরকারি চাকরির জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বেসরকারি খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসা এবং বিরাজমান অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণে সরকারি খাতের সামান্য শূন্য পদের জন্য নজিরবিহীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হচ্ছেন চাকরিপ্রার্থীরা। সম্প্রতি সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাত্র ১ হাজার ৪৮৫টি শূন্য পদের বিপরীতে ২১ লাখ ২৩ হাজারেরও বেশি প্রার্থীর আবেদন জমা পড়েছে। অর্থাৎ প্রতি পদে লড়ছেন প্রায় ১,৪ ৩০ জন প্রার্থী—যা দেশের সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতাভিত্তিক বিসিএস (BCS) পরীক্ষার অনুপাতকেও বড় ব্যবধানে ছাড়িয়ে গেছে। প্রার্থীর এই বিপুল চাপ সামলে কিভাবে পরীক্ষা নেওয়া হবে, তা নিয়ে এখন বড় ধরনের লজিস্টিক ও আর্থিক সংকটে পড়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে কর্তৃপক্ষ।সমাজসেবা অধিদপ্তর গত মে মাসে ১৩তম থেকে ২০তম গ্রেডভুক্ত ৫২টি ক্যাটাগরিতে ১,৪৮৫টি পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। আবেদনের সময়সীমা শেষে দেখা যায়, মোট ২১ লাখ ২৩ হাজার মানুষ আবেদন সম্পন্ন করেছেন। যেখানে সদ্য অনুষ্ঠিত ৫০তম বিসিএসে ২ হাজার ১৫০ পদের বিপরীতে মোট আবেদনকারী ছিলেন ২ লাখ ৯০ হাজার। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সারাদেশের এসএসসি ও সমমানের মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা (১৮ লাখ ৫৭ হাজার) থেকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের এই একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির আবেদনকারীর সংখ্যা অনেক বেশি। ১,৪৮৫টি পদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪৭৮টি পদ রয়েছে ২০তম গ্রেডভুক্ত ‘অফিস সহায়কের’, যার জন্য নূন্যতম যোগ্যতা চাওয়া হয়েছিল এসএসসি।আবেদনের সময়সীমা শেষ হওয়ার তিন মাস পার হতে চললেও প্রার্থীর এই পাহাড়সম চাপ সামলাতে না পেরে এখনো পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করতে পারেনি অধিদপ্তর। বিপুলসংখ্যক কেন্দ্র নির্ধারণ, প্রশ্নপত্র ছাপানো, পরিদর্শক নিয়োগ ও মূল্যায়নের জটিলতা কাটাতে বর্তমানে সংস্থাটি জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে অতিরিক্ত দিকনির্দেশনা ও বাজেট অনুমোদন চেয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ আবু ইউসুফ জানিয়েছেন, দ্রুততম সময়ে স্বচ্ছতার সঙ্গে পরীক্ষা সম্পন্ন করার সম্ভাব্য উপায় ও রূপরেখা নিয়ে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে।অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, বেসরকারি খাতের বিকাশ থমকে যাওয়া এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে স্থায়িত্বের অভাবে তরুণসমাজ সরকারি খাতের দিকে বেশি ঝুঁকছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) সম্প্রতি জানিয়েছে যে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চমাধ্যমিকোত্তর ডিগ্রিধারী তরুণদের প্রায় ৩৬ শতাংশই বর্তমানে বেকার। বিভিন্ন অর্থনীতিবিদের গবেষণায় দেশে কর্মসংস্থানের এই বর্তমান বাস্তবতাকে ‘মহামারি বেকারত্ব’ এবং ‘কর্মসংস্থান জরুরি অবস্থা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি শিল্প-কারখানায় জ্বালানি সংকট ও ব্যবসায়িক মন্দায় নতুন বিনিয়োগ নিরুত্সাহিত হওয়ায় ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি টানা কয়েক মাস ধরে ৫ শতাংশের নিচে (জুলাইয়ে ৪.৬২%) অবস্থান করছে। দেশের শীর্ষ অনলাইন জব পোর্টাল বিডিজবস ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো লোকবল কমানোর পাশাপাশি নতুন চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেওয়া উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দিয়েছে।সিপিডি-র (CPD) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম উল্লেখ করেন, বেসরকারি খাতে প্রবৃদ্ধি না থাকা ও বেতন কাঠামোর অনিশ্চয়তার কারণে সরকারি চাকরির প্রতি এই অতিরিক্ত চাপ অর্থনীতির জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ সংকেত দিচ্ছে। একইসঙ্গে সরকারের এই পদগুলোর প্রকৃত উৎপাদনশীলতা কতটুকু, তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল