প্রিন্ট এর তারিখ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিশ্ব বাঁশ দিবস আজ, পরিবেশ রক্ষায় বাড়ছে বাঁশের গুরুত্ব
ইয়াসরির মাহবুব, স্টাফ রিপোর্টার ||
বাঁশ দেওয়া’ কিংবা ‘বাঁশ খাওয়া’—বাঙালি সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন কথ্য ভাষায় শব্দবন্ধ দুটি নেতিবাচক বা হাস্যরসের খোরাক হিসেবে ব্যবহৃত হলেও বিশ্বমঞ্চে এর অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাঁশ কোনো সাধারণ ঝোপঝাড়ের উদ্ভিদ নয়; বরং এটি ধৈর্য, পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রতীক। প্রতিবছর ১৮ সেপ্টেম্বর পালিত ‘বিশ্ব বাঁশ দিবস’ আমাদের মনে করিয়ে দেয় ঐতিহ্যবাহী এই প্রাকৃতিক সম্পদটির আধুনিক সম্ভাবনা ও পরিবেশগত গুরুত্বের কথা।ওয়ার্ল্ড ব্যাম্বু অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউবিও) আহ্বানে পালিত এই দিবসের ২০২৬ সালের মূল ভাবনা—‘ব্যাম্বু বিয়ন্ড বর্ডারস’ (সীমানা ছাড়িয়ে বাঁশ)। বার্তাটি স্পষ্ট; গ্রাম বাংলার পথের ধার থেকে শুরু করে আধুনিক স্থাপত্য ও আন্তর্জাতিক বাজারে বাঁশকে একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে প্রতিষ্ঠার সময় এসেছে।বাংলাদেশে বাঁশের ইতিহাস সভ্যতার মতোই প্রাচীন। গ্রামীণ জীবনের প্রতিটি বাঁকে বাঁশের উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়। ঘরবাড়ির খুঁটি ও বেড়া, সাঁকো, কৃষিকাজের সরঞ্জাম, মাছ ধরার চাঁই বা চালানি, ঝুড়ি, কুলা থেকে শুরু করে নানা দৃষ্টিনন্দন কুটিরশিল্পে বাঁশই প্রধান ভরসা। চট্টগ্রাম বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) তথ্য অনুযায়ী, দেশের ঐতিহ্য ধরে রাখতে ও প্রজাতি রক্ষায় ষোলশহর ক্যাম্পাসে প্রায় ৩৬ প্রজাতির বাঁশ সংরক্ষিত রয়েছে।তবে সাম্প্রতিক সময়ে জমিতে আধুনিকায়ন, প্লাস্টিকের বিস্তার ও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে বাঁশের স্বাভাবিক সরবরাহ ও ব্যবহারে কিছুটা ভাটা পড়েছে। অথচ ঐতিহ্যগত এই ব্যবহারকে যদি আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তবে এটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটাতে পারে।জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় বাঁশগাছ অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, বাঁশের শিকড় মাটির নিচে জালের মতো ছড়িয়ে থেকে মাটির ক্ষয় প্রতিরোধ করে এবং ভূগর্ভস্থ পানির মান উন্নত করে।পাশাপাশি, এটি বায়ুমণ্ডল থেকে প্রচুর পরিমাণে কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে তার দেহে জমা রাখে। তবে পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল বাঁশ রোপণ করলেই জলবায়ু রক্ষা হবে না; বরং বাঁশের সঠিক কর্তন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পোড়ানো থেকে বিরত থেকে এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সঞ্চিত কার্বন পুনরায় বাতাসে না ছড়ায়।বিশ্বজুড়ে আজ পরিবেশবান্ধব বিকল্পের খোঁজ চলছে, যেখানে প্লাস্টিক ও কাঠের সেরা বিকল্প হয়ে উঠেছে বাঁশ। আধুনিক প্রকৌশল বিদ্যা ব্যবহার করে বাঁশ দিয়ে তৈরি হচ্ছে আসবাবপত্র, প্রকৌশলজাত ফাইবার, টেক্সটাইল কাপড়, পরিবেশবান্ধব কাগজ, জৈব জ্বালানি, এমনকি সাইকেলের ফ্রেমের মতো টেকসই পণ্য।বাংলাদেশেও বিএফআরআই ২০০৫ সাল থেকে বাঁশের ‘কম্পোজিট বোর্ড’ ও কাঠভিত্তিক আসবাবের বিকল্প তৈরির সফল প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। যা বন উজাড় রোধে বিশাল ভূমিকা রাখতে সক্ষম।বিশ্ব বন ও খাদ্য সংস্থা (এফএও) মনে করে, বাঁশভিত্তিক অর্থনীতির প্রকৃত সুফল পেতে হলে স্থানীয় কৃষক, কারুশিল্পী ও প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের ন্যায্য পাওনা ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। ভিয়েতনামের মতো দেশে বাঁশচাষি নারীদের সমবায়ের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার মডেল বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে।বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এবং কাঠ ও প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে পরিবেশকে বাঁচাতে বাঁশের পরিকল্পিত রূপান্তর জরুরি। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া, বাজারজাতকরণে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং টেকসই রোপণ কাঠামোর মাধ্যমেই বাঁশ হয়ে উঠতে পারে নতুন যুগের এক ‘সবুজ সোনা’।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল