প্রিন্ট এর তারিখ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দেশীয় গ্যাস-কয়লা ছেড়ে আমদানিনির্ভরতা, কেন এই জ্বালানি সংকট?
ইয়াসরির মাহবুব, স্টাফ রিপোর্টার ||
বাংলাদেশে চলমান তীব্র জ্বালানি সংকট কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং বিগত দুই দশকের ভুল নীতি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব এবং সাময়িক সমাধানের লক্ষ্যে অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতারই এক অনিবার্য পরিণতি। ২০০২ সালের প্রাক্কলন অনুযায়ীই স্পষ্ট জানা ছিল যে, ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত শেষ হয়ে আসবে। কিন্তু সে অনুযায়ী টেকসই সমাধানের দিকে না গিয়ে তৎকালীন ও পরবর্তী সরকারগুলো আমদানিভিত্তিক তাৎক্ষণিক স্বস্তির পথ বেছে নেয়। এই আমদানিনির্ভরতা আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে এবং দেশকে এক চরম আর্থিক ও কৌশলগত সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।জাতীয় জ্বালানি খাতকে স্বাবলম্বী করতে বিশেষজ্ঞরা শুরু থেকেই তিনটি প্রধান বিষয়ের ওপর জোর দিয়ে আসছেন। এগুলো হলো দেশীয় কয়লা উত্তোলন, স্থলভাগ ও সমুদ্রে জোরালো গ্যাস অনুসন্ধান এবং ব্যাপক মাত্রায় নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের প্রসারণ। তবে বিগত সরকারের দীর্ঘ শাসনকাল কিংবা অন্তর্বর্তীকালীন ইউনূস প্রশাসন কারো আমলেই এই মূল ক্ষেত্রগুলোতে আশাব্যঞ্জক ও গতিশীল কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।দেশে বিপুল পরিমাণ উন্নতমানের কয়লার মজুত থাকা সত্ত্বেও ২০০৬ সালের ফুলবাড়ী আন্দোলনের পর উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন স্থায়ীভাবে থমকে যায়। ফলস্বরূপ, বর্তমানে রামপাল, পায়রা ও মাতারবাড়ীর মতো বৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু রাখতে প্রতি বছর দেশকে ১.২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের কয়লা আমদানি করতে হচ্ছে। একইভাবে ১৯৯৮ সালে বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের পর দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানে বড় কোনো সাফল্য আসেনি। ২০১১ সালে মার্কিন কোম্পানি কনোকোফিলিপস বঙ্গোপসাগরের গভীরে ৫ থেকে ৭ টিসিএফ গ্যাসের বিশাল সম্ভাবনার কথা জানালেও পিএসসির শর্ত নিয়ে দরকষাকষির ব্যর্থতায় তারা কাজ গুটিয়ে নেয়। পরবর্তীতে অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান জোরদার না করে উচ্চমূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির নীতি গ্রহণ করা হয়, যা বর্তমানে বার্ষিক প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার চাপ তৈরি করছে।নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতার একই চিত্র দেখা গেছে। ২০১০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা থাকলেও স্বল্পমেয়াদি তেলভিত্তিক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টের প্রতি ঝুঁকে পড়ায় সে লক্ষ্য হাতছাড়া হয়। সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের অজুহাতে পূর্বের ৩১টি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্পের লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) বাতিল করায় এ খাতে নতুন করে স্থবিরতা তৈরি হয়। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বার্ষিক প্রায় ৮২০ মিলিয়ন ডলারের জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি সাশ্রয় সম্ভব হতো।বর্তমান বিএনপি সরকার অবশ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন লক্ষ্যমাত্রা ও সৌর উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি ডেনমার্কের প্রস্তাবে ৫০০ মেগাওয়াটের অফশোর উইন্ড ফার্ম নির্মাণের প্রক্রিয়াও এগোচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কেবল আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না থেকে এলএনজি আমদানির উচ্চসীমা নির্ধারণ, অপচয় রোধ, সমুদ্রে নতুন পিএসসি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির সমন্বয়ে নিজস্ব কয়লা উত্তোলনের মতো কঠিন নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল