প্রিন্ট এর তারিখ : ১৪ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৪ জুলাই ২০২৬
১৪ জুলাই: কোটা আন্দোলনের টার্নিং পয়েন্ট
ইয়াসরির মাহবুব, স্টাফ রিপোর্টার ||
২০২৪ সালের ১৪ জুলাই বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনের ইতিহাসে একটি চরমতম উত্তেজনাকর এবং টার্নিং পয়েন্ট ছিল। টানা কয়েকদিন ধরে চলা ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির মধ্যেই এদিন আন্দোলন একটি ভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক মাত্রা পায়। দুপুরের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার করা একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাতারাতি ক্ষোভে ফেটে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হাজারো শিক্ষার্থী। ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’ স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে রাজপথ, যা পরবর্তী দিনগুলোর সংঘাত ও আন্দোলনের প্রধান প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।১৪ জুলাই সকাল থেকেই ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ দেশের প্রায় সবকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে বিক্ষোভ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের বিরুদ্ধে এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগের দাবিতে রাজপথে নামেন তারা। আন্দোলনের সমন্বয়করা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানালেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ স্পষ্ট ছিল। শিক্ষক, সাবেক শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও তখন সংলাপের মাধ্যমে এই সংকট সমাধানের তাগিদ দিচ্ছিলেন।দিনের সবচেয়ে বড় মোড়টি আসে বিকেল বেলা। গণভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কোটা আন্দোলন নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্তব্য করেন, “মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুঁতিরা চাকরি পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতি-পুঁতিরা চাকরি পাবে?”এই বক্তব্য মুহূর্তের মধ্যে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীরা চরম অপমানিত বোধ করেন। যৌক্তিক দাবি আদায়ের আন্দোলনকে ‘রাজাকার’ তকমার সাথে যুক্ত করার প্রতিবাদে সন্ধ্যার পর থেকেই ঢাবি ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের জটলা বাড়তে থাকে। রাত ১০টার পর হলগুলোতে ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়। বিজয় একাত্তর হল থেকে প্রথম স্লোগান ওঠে— “তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার; কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার।” ব্যঙ্গাত্মক এই প্রতিবাদের স্লোগান মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে হল থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে আসেন। বিশেষ করে রোকেয়া হলসহ বিভিন্ন হলের নারী শিক্ষার্থীরা তালা ভেঙে, থালা-বাসন বাজিয়ে রাজপথে মিছিলে যোগ দেন। আন্দোলনের ইতিহাসে এই ঘটনাটিকে অন্যতম মাইলফলক হিসেবে দেখা হয়। এতদিন আন্দোলনের অগ্রভাগে ছাত্ররা থাকলেও, ১৪ জুলাই মধ্যরাত থেকে ছাত্রীদের এই সাহসী ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ পুরো আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সহমর্মিতা তৈরি করে।শুধু ঢাবিতেই নয়, রাতেই মশাল মিছিল শুরু হয় রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘আমি রাজাকার’ হ্যাশট্যাগ ও ব্যঙ্গাত্মক পোস্টার ভাইরাল হয়ে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, ১৪ জুলাই ছিল সেই দিন, যেদিন কোটা সংস্কার আন্দোলনটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের আত্মমর্যাদার লড়াইয়ে রূপ নেয়। এই ক্ষোভের সূত্র ধরেই ১৫ জুলাই থেকে ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রলীগ ও বহিরাগতদের হামলা শুরু হয়, যা পরবর্তীতে দেশজুড়ে এক রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের দিকে ধাবিত করে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল