প্রিন্ট এর তারিখ : ০৭ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুলাই ২০২৬
চীনের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা ঘিরে নতুন বৈশ্বিক উত্তেজনা
শামিমা লিয়া, আন্তর্জাতিক ডেস্ক এডিটর ||
প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের দূরপাল্লার পরমাণু সক্ষমতাসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার পর বিশ্বজুড়ে তীব্র উদ্বেগ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। বেইজিংয়ের দ্রুত সামরিক আধুনিকীকরণ ও পারমাণবিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে চালানো এই পরীক্ষাটিকে কেন্দ্র করে সোমবার (৬ জুলাই) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশ।দুই বছর আগে চীন ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়ার কাছে আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (ICBM) নিক্ষেপ করেছিল, যা ছিল দীর্ঘ ৪০ বছরের মধ্যে তাদের প্রথম এমন পরীক্ষা। আর এবারের পরীক্ষাটি আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানার ক্ষেত্রে চীনের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতারই প্রমাণ বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা।মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট এক বিবৃতিতে বলেন, “এমন এক সময়ে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করছে, চীন ঠিক তার উল্টোটা করছে। বেইজিংয়ের দ্রুত ও অস্বচ্ছ পারমাণবিক অস্ত্রের মজুত বৃদ্ধি এই অঞ্চল এবং সমগ্র বিশ্বের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।”গত ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার সঙ্গে করা সর্বশেষ প্রধান অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি 'নিউ স্টার্ট' (New START)-এর মেয়াদ শেষ হতে দেয় যুক্তরাষ্ট্র, কারণ ওয়াশিংটন এই চুক্তিতে চীনকেও অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিল। তবে চীনের পক্ষ থেকে সেই আহ্বান বারবার প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এই ঘটনার পর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর চীনকে অর্থপূর্ণ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আলোচনায় বসার এবং ক্ষেপণাস্ত্র বা মহাকাশ উৎক্ষেপণের ক্ষেত্রে নিয়মিত পূর্ব-বিজ্ঞপ্তি বা নোটিফিকেশন ব্যবস্থা চালু করার তাগিদ দিয়েছে।স্বশাসিত গণতান্ত্রিক দ্বীপ দেশ তাইওয়ান জানিয়েছে, চীন যে ক্ষেপণাস্ত্রটি পরীক্ষা করেছে তা মূলত একটি 'জেএল-২' (JL-2) মডেলের ক্ষেপণাস্ত্র। মার্কিন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা বা আঘাত হানার ক্ষমতা অন্তত ৮,০০০ কিলোমিটার। তাইওয়ানের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি জেনারেল জোসেফ উ এক এক্স (টুইটার) পোস্টে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ক্ষেপণাস্ত্রটি ফিলিপাইনের ওপর দিয়ে গেছে। চীন আবারও প্রমাণ করল যে তারা এই অঞ্চলের বড় সন্ত্রাসী বা 'বুলি'।দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধে থাকা ফিলিপাইন এই পরীক্ষাকে সামরিক শক্তির 'বেপরোয়া প্রদর্শন' বলে আখ্যা দিয়েছে। ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষা দপ্তর এক বিবৃতিতে জানায়, এই উৎক্ষেপণের কোনো শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্য নেই, বরং এটি তাদের বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পিত উসকানি যারা চীনের অবৈধ সম্প্রসারণবাদ ও জবরদস্তিমূলক আচরণের বিরোধিতা করে।নিউজিল্যান্ড জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের মাত্র দুই ঘণ্টা আগে চীন প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোকে বিষয়টি অবহিত করেছিল, তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো পূর্ব-সতর্কবার্তা দিয়েছিল কি না তা স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে, চীনা নৌবাহিনীর মুখপাত্র ওয়াং শুয়েমেং এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, এই উৎক্ষেপণটি চীনের বার্ষিক সামরিক প্রশিক্ষণের একটি নিয়মিত অংশ এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে আগেই জানানো হয়েছিল।পর্যবেক্ষকদের মতে, পারমাণবিক সাবমেরিন থেকে নিখুঁতভাবে উৎক্ষেপণ করা এই রকেটটি দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের সলোমন দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি গিয়ে পতিত হয়। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওয়াং চীনের এই পরীক্ষাকে এই অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত অস্থিতিশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন। জাপান জানিয়েছে, তাদের আগে জানানো হলেও তারা চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে চীনের মিত্রদেশ রাশিয়া এই পরীক্ষাকে বেইজিংয়ের 'সার্বভৌম অধিকার' বলে ডিফেন্ড করেছে এবং জানিয়েছে চীন বিশ্বের কাউকে হুমকি দিচ্ছে না।সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সাবমেরিন থেকে এত দীর্ঘ দূরত্বের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা এটাই প্রমাণ করে যে চীন এখন নিজ জলসীমার কাছাকাছি অবস্থান করেই আমেরিকার মূল ভূখণ্ডকে নিশানা করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। কাকতালীয়ভাবে, এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার দিনেই অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ফিজির একটি বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব মোকাবিলারই অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল