প্রিন্ট এর তারিখ : ০৬ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুলাই ২০২৬
চলন্ত জাহাজে আঘাত হানবে তুরস্কের ‘তাইফুন’
শামিমা লিয়া, আন্তর্জাতিক ডেস্ক এডিটর ||
বিশ্বের হাতেগোনা কয়েকটি দেশের এলিট ক্লাবে (বিশেষ তালিকা) যুক্ত হলো তুরস্ক। সম্প্রতি দেশটির অন্যতম প্রধান ডিফেন্স ম্যানুফ্যাকচারার (প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতা) ‘রকেটসান’ তাদের তৈরি ‘তাইফুন ব্লক-৩’ (Tayfun Block-3) ব্যালিস্টিক মিসাইলের একটি সফল লাইভ-ফায়ার পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। এই পরীক্ষার মাধ্যমে তুরস্ক প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি একটি ‘সিকার হেড’ সম্বলিত ব্যালিস্টিক মিসাইলকে সাগরে চলমান কোনো লক্ষ্যবস্তুর ওপর নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম হলো। এর ফলে তাইফুন ব্লক-৩ এখন অফিশিয়ালি একটি ‘অ্যান্টি-শিপ ব্যালিস্টিক মিসাইল’ বা এএসবিএম (ASBM) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল।পরীক্ষামূলক এই উৎক্ষেপণে মিসাইলটি হাইপারসনিক টার্মিনাল স্পিডে (শব্দের চেয়ে কয়েক গুণ দ্রুত গতিতে) আকাশ থেকে নেমে এসে সাগরে ভাসমান প্রায় ৭ মিটার দীর্ঘ একটি চালকহীন ছোট বোট বা আনম্যানড সারফেস ভেসেলকে (USV) সার্জিক্যাল প্রিসিশন বা নিখুঁতভাবে ধ্বংস করে। সাধারণ ব্যালিস্টিক মিসাইলগুলো মূলত ম্যাপ বা মানচিত্রের কোনো একটি নির্দিষ্ট ও স্থির লক্ষ্যবস্তুর ওপর আঘাত হানার জন্য তৈরি করা হয়। কিন্তু সাগরে চলমান কোনো যুদ্ধজাহাজ বা লক্ষ্যবস্তু মিসাইলটি আকাশে থাকার সময়েই তার গতিপথ পরিবর্তন করে ফেলতে পারে। এই কঠিন সমস্যার সমাধান করেছে রকেটসানের তৈরি নতুন এই সিকার হেড ও সেন্সর প্যাকেজ, যা মিসাইলের নোজ বা সামনের অংশে বসে চূড়ান্ত মুহূর্তেও চলমান লক্ষ্যবস্তুকে ট্র্যাক করে তার দিকে ধেয়ে যেতে পারে। বিশ্বে এই প্রযুক্তির সফল ব্যবহার খুব কম দেশেরই রয়েছে, যার মধ্যে চীনের ‘ডিএফ-২১ডি’ সবচেয়ে আলোচিত। এই সফলতার মাধ্যমে তুরস্ক এখন সেই বিশেষ তালিকায় নিজের নাম লেখালো।তুরস্কের প্রেসিডেন্সি অব ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিজ এবং রকেটসান যৌথভাবে এই মিসাইল সিস্টেমটি তৈরি করেছে। ২০২২ সালের অক্টোবরে এর প্রথম পরীক্ষাটি ভুলবশত প্রকাশ হয়ে পড়ার পর গ্রিসের সঙ্গে তুরস্কের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। এরপর ২০২৩ এবং ২০২৫ সালের বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষার পর তাইফুনকে আরও বড় ও শক্তিশালী করার প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের জুলাই মাসে তুরস্কের ‘আইডিইএফ’ (IDEF) ডিফেন্স এক্সিবিশনে আরও বড় আকৃতির ‘তাইফুন ব্লক-৪’ উন্মোচন করা হয়, যার ওজন প্রায় ৭,২০০ কিলোগ্রাম এবং এটি ম্যাক-৫ এর চেয়েও বেশি গতিসম্পন্ন।রকেটসানের সিইও মুরাত ইকিনজি জানান, ২০২৫ সালেই তাদের কোম্পানির ডিফেন্স এক্সপোর্ট বা রপ্তানি ৭৫০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং মোট রেভিনিউ দাঁড়িয়েছে ২ বিলিয়ন ডলারে। তুরস্কের স্পেশাল ফোর্সেস কমান্ডও সম্প্রতি তাদের বহরে নতুন করে একঝাঁক ‘তাইফুন ব্লক-২’ মিসাইল যুক্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এর পাশাপাশি রকেটসান ‘জেঙ্ক’ (Cenk) নামের আরও একটি বিশাল ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করছে, যা একটি ৮×৮ ট্রাকের ট্রেলারে বহন করতে হয় এবং এতে ম্যানুভ্যারেবল রিঅ্যান্ট্রি ভেসেল বা ডেক্লাইন মোডে দিক পরিবর্তনকারী ওয়ারহেড থাকতে পারে বলে ডিফেন্স অবজারভাররা ধারণা করছেন। সিরিয়ায় সামরিক উপস্থিতি এবং ভূমধ্যসাগরে গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে মেরিটাইম বা জলসীমা নিয়ে চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনার মাঝে তুরস্কের এই নতুন অ্যান্টি-শিপ ব্যালিস্টিক মিসাইল সক্ষমতা অর্জন দেশটির সামরিক ও কৌশলগত অবস্থানকে বহুগুণ শক্তিশালী করল।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল