প্রিন্ট এর তারিখ : ০১ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০১ জুলাই ২০২৬
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের দুই বছর: রক্তঝরা ১ জুলাই
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
আজ ঐতিহাসিক ১ জুলাই। ২০২৪ সালের এই রক্তঝরা দিনটিতেই মূলত এক নতুন গতি পেয়েছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ও রক্তাক্ত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া একটি সাধারণ ছাত্র আন্দোলন কীভাবে পরবর্তী ৩৬ দিনে এক দফার গণ-আন্দোলনে রূপ নিয়ে ১৫ বছরের একচ্ছত্র স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন ঘটিয়েছিল, আজ তার দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে সেই স্মৃতি রোমন্থন করছে পুরো জাতি। রক্তগঙ্গা পেরিয়ে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে যে নতুন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল, আজ দুই বছর পর প্রশ্ন উঠেছে—শহীদদের সেই রক্তের মর্যাদা এবং বৈপ্লবিক আকাঙ্ক্ষা কতটা রক্ষা করতে পেরেছে নতুন সরকার ও আন্দোলনকারীরা?আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের আদালতের রায়কে কেন্দ্র করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জমতে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির মাধ্যমে। ২ থেকে ৬ জুলাইয়ের মধ্যে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এই দ্রোহের আগুন।আন্দোলনে চূড়ান্ত ঘি ঢালকার কাজ করে ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সেই দাম্ভিক মন্তব্য, যেখানে তিনি আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের নাতি-পুতি’ বলে তাচ্ছিল্য করেন। এর প্রতিবাদে তৎকালীন অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক ও বর্তমান সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানান।১৬ জুলাই আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের বন্দুকের সামনে বুক পেতে দিয়ে শহীদ হন সমন্বয়ক আবু সাইদ। তাঁর এই আত্মত্যাগ আন্দোলনকে দাবানলের মতো ছড়িয়ে দেয়। এরপর আসে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’।ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, কারফিউ এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নির্বিচার গুলির মুখেও দমে যায়নি ছাত্র-জনতা। সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামসহ অন্যান্যদের গুম ও ডিবি হেফাজতে নিয়ে ‘সংবাদ সম্মেলন নাটক’ করানোর পরও রাজপথের গ্রাফিতি আর গণগ্রেপ্তারের প্রতিবাদে সাধারণ মানুষ নেমে আসে রাস্তায়।৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের লাখো জনতার মহাসমাবেশ থেকে আসে ঐতিহাসিক ‘এক দফা’—সরকার পতনের ঘোষণা। প্রথমে ৬ আগস্ট ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ ঘোষণা করা হলেও পরিস্থিতির ভয়াবহতায় তা এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট করা হয়।৫ আগস্ট সকালে কারফিউ ভেঙে ঢাকার প্রতিটি প্রবেশমুখ দিয়ে ধেয়ে আসে লাখো-কোটি মানুষের জনস্রোত। ছাত্র-জনতার সেই অভূতপূর্ব মহাসমুদ্রের সামনে সব দাম্ভিকতা চূর্ণ করে ছোট বোন শেখ রেহানাকে সাথে নিয়ে সামরিক হেলিকপ্টারে চেপে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। অবসান ঘটে ১৫ বছরের এক স্বৈরাচারী অধ্যায়ের।রিকশাচালক, শিক্ষার্থী, দিনমজুর থেকে শুরু করে শিশুসহ প্রায় ১৪০০ মানুষের জীবন এবং হাজার হাজার মানুষের পঙ্গুত্বের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতার দুই বছর পূর্ণ হলো আজ (১ জুলাই, ২০২৬)। এই দুই বছরে বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রকাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ নাহিদ ইসলাম এখন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ, তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে নতুন সরকার এবং জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান পালন করছেন বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব।তবে রাজপথের সেই বিপ্লবীদের স্বপ্ন ও সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা পুরোপুরি পূরণ হওয়া নিয়ে এখনো জনমনে নানা প্রশ্ন ও অসন্তোষ রয়েছে। আজ গণকবর জিয়ারত শেষে খোদ নাহিদ ইসলামও আক্ষেপ করে বলেছেন যে, জুলাইয়ের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ এখনো পাওয়া যায়নি এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় ধীরগতি দৃশ্যমান। সংবিধানে কেবল ‘সংশোধন’ নাকি আমূল ‘সংস্কার’ হবে—তা নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে রয়েছে কৌশলগত দ্বিমত। সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের বাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এখনো পুরোপুরি ভাঙা যায়নি।তবু, এই দুই বছরে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো—সংবিধানে ‘জুলাই সনদ’-কে অন্তর্ভুক্ত করে ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান ঠেকানোর রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার এবং নাগরিকের বাক-স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার। একটি স্বৈরাচারমুক্ত, জবাবদিহিমূলক ও সুশাসিত বাংলাদেশ গড়ার যে পথযাত্রা ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শুরু হয়েছিল, সেই পথ এখনো দীর্ঘ। শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ করে রাষ্ট্র সংস্কারের মূল এজেন্ডায় সরকার ও বিরোধী পক্ষকে এক হয়ে কাজ করতে হবে—আজকের এই ঐতিহাসিক দিনে এটাই দেশের ১৬ কোটি মানুষের প্রধান প্রত্যাশা।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল