প্রিন্ট এর তারিখ : ৩০ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুন ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের ১০৯ বছরের সংকট, ভার্সাইয়ে নতুন সমঝোতা
মোঃ রফিকুল ইসলাম , স্টাফ রিপোর্টার ||
প্রায় ১০৯ বছর আগে মাত্র ৬৭টি শব্দের একটি চিঠি দিয়ে যে মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল, দীর্ঘ সময় পর ফ্রান্সের সেই ঐতিহাসিক ভার্সাই নগরীতেই ৮০০ শব্দের এক নতুন সমঝোতার মাধ্যমে তা নেভানোর চেষ্টা চলছে। ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার আর্থার ஜেমস বেলফোর ফিলিস্তিনিদের মতামতের তোয়াক্কা না করে ‘ইহুদিদের জন্য জাতীয় আবাসভূমি’ গড়ার যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম দেয়। শতবর্ষ ধরে চলা সেই সংকটের জেরে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্য এক ভয়াবহ যুদ্ধের মুখোমুখি হয়। তবে গত ১৭ জুন ফ্রান্সের ভার্সাইয়ে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের আচমকা ‘১৪-দফা শান্তি সমঝোতা’ স্বাক্ষর বিশ্বরাজনীতিতে নতুন এক নাটকীয় মোড় এনে দিয়েছে।গত ২৮ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষাপটেই আক্রান্ত হয় পারস্য উপসাগরীয় এই দেশটি। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইরানজুড়ে আচমকা ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। দীর্ঘ চার মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই বিধ্বংসী যুদ্ধের আঁচ সারা বিশ্বের অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে এসে পড়ে। এই চরম উত্তেজনার মাঝেই ১৯১৯ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত ভার্সাই নগরীতে নতুন ইতিহাস লিখলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরান শান্তি চুক্তি সংক্রান্ত ১৪-দফা সমঝোতাপত্রে সই করে তিনি সবাইকে চমকে দেন। এই সমঝোতা নিয়ে হোয়াইট হাউস এতটাই উৎফুল্ল যে, পূর্বপরিকল্পিত সময়ের দুইদিন আগেই চুক্তিটি কার্যকরের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মনে এখন বড় প্রশ্ন—১০০ বছর ধরে জ্বলতে থাকা মধ্যপ্রাচ্যের আগুন নেভাতে ৮০০ শব্দের এই চুক্তি কি আসলেই সফল হবে, নাকি তেহরানের কূটনীতিকদের চতুর চালের কাছে হেরে গেল ওয়াশিংটন?ভার্সাইয়ের এই নতুন চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এবং তাদের পরম মিত্র ইসরায়েলে খুব একটা ইতিবাচকভাবে নেওয়া হচ্ছে না। সমালোচকদের মতে, তুলনামূলক দুর্বল ইরানের ওপর যে লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ধ্বংসাত্মক হামলা চালিয়েছিল, তার একটিও পূরণ হয়নি। তেহরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো তো দূরের কথা, উল্টো এই যুদ্ধের পর ইরান বিশ্বমঞ্চে আরও শক্তিশালী হয়ে আবির্ভূত হয়েছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন জনমত জরিপেও এই ব্যর্থতার চিত্র স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। গত ১৯ জুন প্রকাশিত মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি-এনওআরসির জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৬৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের এই শান্তি ব্যবস্থাপত্র ও সমঝোতার প্রতি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে, গত ২১ জুন ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলের জরিপে দেখা গেছে, ইসরায়েলের রেকর্ড ৯২ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করে যে এই চার মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানই বিজয়ী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সিবিএস নিউজ ও ইউগভের জরিপে দেখা গেছে, ৩৭ শতাংশ মার্কিনি মনে করেন এই সমঝোতা চুক্তির সমস্ত শর্ত ও কৌশলগত সুবিধা সম্পূর্ণভাবে ইরানের পক্ষে গিয়েছে।প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. রয় কাসাগ্রান্ডা এই চুক্তিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্পষ্ট ‘আত্মসমর্পণ’ বলে অভিহিত করেছেন। সাড়ে চার হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতার দেশ ইরানকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার একের পর এক হুমকি দিয়েও ট্রাম্পকে যেভাবে বারবার পিছু হটতে হয়েছে, তা মার্কিন সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।১ শতক আগে যে ভার্সাইয়ের মাটিতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ‘বেলফোর ঘোষণা’র মাধ্যমে আজকের ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের বীজ বপন করা হয়েছিল, ঠিক সেই মাটিতেই এবার ৮০০ শব্দের চুক্তির মাধ্যমে সংকটের সমাধানের চেষ্টা চলছে। তবে মার্কিন জনগণের দুই-তৃতীয়াংশের অসন্তোষ এবং ইসরায়েলিদের পরাজয় মেনে নেওয়ার এই মনস্তত্ত্ব প্রমাণ করে যে, এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনতে পারবে কি না তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে। ইতিহাস সাক্ষী, ভার্সাইয়ের চুক্তি অনেক সময় নতুন কোনো মহাবিপর্যয়ের কারণও হতে পারে; এখন দেখার বিষয় ৮০০ শব্দের এই নতুন জুয়া কার ভাগ্যের ভরাডুবি ঘটায়।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল