প্রিন্ট এর তারিখ : ৩০ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুন ২০২৬
ভূমি সেবায় ডিজিটাল রূপান্তর, কমবে কি দুর্নীতি?
আহমেদ রিয়াদ , নিউজ এডিটর ||
বাংলাদেশে জমি কেনা, বিক্রি ও নামজারির (মিউটেশন) ঐতিহ্যবাহী প্রক্রিয়াটি সাধারণ মানুষের কাছে বরাবরই এক আতঙ্কের নাম। বছরের পর বছর ধরে চলা আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা ঘুষের সংস্কৃতি থেকে নাগরিক সমাজকে মুক্তি দিতে সরকার এখন প্রযুক্তির শরণাপন্ন হয়েছে। জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি, ‘ভূমি দৃষ্টি’ ট্র্যাকিং এবং সমন্বিত মোবাইল অ্যাপের মতো একাধিক আধুনিক ডিজিটাল উদ্যোগের মাধ্যমে ভূমি খাতের ভোল পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। সরকারের মূল লক্ষ্য হলো—সেবাগ্রহীতা ও কর্মকর্তার মধ্যকার সরাসরি শারীরিক বা মানবিক যোগাযোগ যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা, যাতে আর্থিক লেনদেন বা হয়রানির সুযোগ বন্ধ করা যায়। তবে প্রশ্ন উঠেছে, কয়েক দশকের পুরোনো এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেওয়া একটি দুর্নীতির ব্যবস্থাকে কি কেবল একটি ‘মোবাইল অ্যাপ’ দিয়ে উপড়ে ফেলা সম্ভব?ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে এক লাখের বেশি ডাউনলোড হওয়া অফিশিয়াল 'ভূমি অ্যাপ'-এর মাধ্যমে নাগরিকেরা ঘরে বসেই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সেবা পাচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে ই-মিউটেশনের আবেদন ও এর অগ্রগতি ট্র্যাকিং, ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধ, খতিয়ান ও মৌজা মানচিত্রের ডিজিটাল কপি সংগ্রহ এবং উত্তরাধিকার হিসাব নির্ধারণের মতো জটিল বিষয়।মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কর্মস্থলে ফাঁকি দেওয়া এবং অনুপস্থিতির পুরোনো রোগ সারাতে মন্ত্রণালয় এবার যুক্ত করছে ‘ভূমি দৃষ্টি’ নামক একটি বিশেষ ট্র্যাকিং ব্যবস্থা। জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তির সাহায্যে প্রতিটি ভূমি অফিসের চারপাশজুড়ে একটি ভার্চুয়াল সীমানা বা ডিজিটাল বাউন্ডারি নির্ধারণ করা থাকবে। কোনো কর্মকর্তা অফিস চলাকালীন সেই সীমানার বাইরে গেলে কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডে তা তাৎক্ষণিকভাবে ধরা পড়বে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের ধারণা, মানুষ যত বেশি ডিজিটাল মাধ্যমে সেবা নিতে অভ্যস্ত হবে, মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালদের ওপর নির্ভরশীলতা ততটাই কমে আসবে।ডিজিটাল এই রূপান্তর শহরাঞ্চলে সুফল দিলেও গ্রামীণ স্তরে এর কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে। ঢাকার বাসিন্দা রাশেদুল ইসলামের মতো অনেকেই অনলাইনের সুফল পাচ্ছেন এবং সময়-শ্রম দুটোই বাঁচাতে পারছেন। কিন্তু প্রান্তিক ও গ্রামীণ এলাকার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঝিনাইদহের শৈলকুপার বাসিন্দা আখতার হোসেনের মতে, গ্রামীণ জনপদে এখনো ইন্টারনেট সংযোগের সীমাবদ্ধতা এবং ডিজিটাল দক্ষতার অভাব একটি বড় বাধা। ফলে অনেক সাধারণ মানুষ এখনো বিশ্বাস করেন যে, দালালের মাধ্যমে সরাসরি ‘ফাইল’ না এগোলে কাজ সম্পন্ন হবে না।এই বাস্তবতাকে মাথায় রেখে সরকার অবশ্য সারা দেশে ৮৯৩টি বিশেষ সেবা কেন্দ্র অনুমোদন দিয়েছে, যেখানে নামমাত্র ফিতে ডিজিটাল সেবা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া গ্রামীণ এলাকার মানুষকে অনলাইন ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত করতে স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়ের মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণাসহ নির্দেশনামূলক ভিডিও প্রদর্শন করা হচ্ছে।ভূমি খাতের দুর্নীতি চিত্র (টিআইবি জরিপ):┌───────────────────────────────┬───────────────────────────┐│ সূচক │ পরিসংখ্যান │├───────────────────────────────┼───────────────────────────┤│ দুর্নীতির শিকার পরিবার (২০২৬) │ ৬৬.২% ││ দুর্নীতির শিকার পরিবার (২০২৩) │ ৫১% ││ ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়া সেবাগ্রহীতা│ ৪৭.৬% ││ পরিবার প্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ │ ১১,৩১০ টাকা ││ দেশব্যাপী মোট ঘুষের লেনদেন │ ৩,০৮১ কোটি টাকা │└───────────────────────────────┴───────────────────────────┘ভূমি খাতের অনিয়মের আরেকটি বড় উৎস এর দ্বি-মুখী প্রশাসনিক কাঠামো। সাধারণ মানুষের ধারণা সাব-রেজিস্ট্রার অফিস ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে, কিন্তু বাস্তবে দলিল নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশনের মূল কাজটি পরিচালিত হয় আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে। অন্যদিকে খতিয়ান বা নামজারির কাজটি করে ভূমি মন্ত্রণালয়। এই দুই মন্ত্রণালয়ের কাজের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবকে অনিয়ম ও জাল দলিলের অন্যতম প্রধান কারণ বলে মনে করা হয়।এই জটিলতা কাটাতে সরকার এখন ডিজিটাল ক্যাডাস্ট্রাল জরিপ সম্প্রসারণ এবং কেন্দ্রীয় ভূমি তথ্যভাণ্ডার তৈরির মাধ্যমে নিবন্ধন ব্যবস্থাকে ভূমি তথ্য ব্যবস্থার (Land Information System) সঙ্গে যুক্ত করার কাজ শুরু করেছে। এছাড়া ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের টাকা সরাসরি উপকারভোগীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠাতে ‘iBAS++’ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেন সরকারি কোষাগার থেকে টাকা ছাড়ের সময় কোনো মধ্যস্থতাকারী কমিশন দাবি করতে না পারে।ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পরও ভূমি খাতে দুর্নীতি ও ঘুষের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, যা ২০২৩ সালের ৫১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ৬৬.২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের আদালতগুলোতে বিচারাধীন ৪৭ লাখের বেশি মামলার একটি বড় অংশই ভূমি বিরোধ সংক্রান্ত।এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, দুর্নীতি দমনে প্রযুক্তি একটি চমৎকার অনুঘটক বা টুল হতে পারে, কিন্তু তা কোনো জাদুকরী সমাধান নয়। যতক্ষণ না পর্যন্ত মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটবে, দলাদলি ও রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ হবে এবং আইন ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের মধ্যকার প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব ঘুচবে, তত দিন পর্যন্ত কেবল একটি মোবাইল অ্যাপের পক্ষে শত বছরের জট পাকানো ‘ভূমি অফিস’ সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত করা কঠিন। প্রযুক্তির টেকসই ব্যবহারের পাশাপাশি প্রয়োজন কঠোর প্রশাসনিক জবাবদিহি ও আইনি সংস্কারের বাস্তবমুখী প্রয়োগ।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল