প্রিন্ট এর তারিখ : ৩০ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুন ২০২৬
পুরোনো মালিকদের ব্যাংকে ফেরার বিধান বাতিল
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের সমাপনী বক্তব্যে ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের বহুল বিতর্কিত ও সমালোচিত ১৮(ক) ধারাটি পুরোপুরি বিলোপের ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একই সঙ্গে একীভূত হওয়া পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক (ইসলামী) ব্যাংকের সাধারণ আমানতকারীদের টাকা ফেরতের একটি সুনির্দিষ্ট পথনকশা বা রোডম্যাপও সংসদে উপস্থাপন করেছেন তিনি।অংশীজন ও অর্থনীতিবিদদের মতামতের ভিত্তিতে ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন, ২০২৬-এর বিতর্কিত ১৮(ক) ধারাটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, জনগণের সম্পদ যারা লুট করেছে, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। উল্লেখ্য, গত ১০ এপ্রিল অন্তর্বর্তী সরকারের করা একটি অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করে বর্তমান সরকার। কিন্তু আইনটি পাসের ঠিক আগমুহূর্তে যুক্ত করা ১৮(ক) ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক দেউলিয়া বা রেজোল্যুশনের আওতায় যাওয়ার আগে যারা এর মালিক বা শেয়ারহোল্ডার ছিলেন, তারা চাইলে পরবর্তীতে পুনরায় সেই ব্যাংকের মালিকানা ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আবেদনের সুযোগ পেতেন। এই ধারা যুক্ত হওয়ার পর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল—এস আলমের মতো বিতর্কিত ও পলাতক ব্যাংক লুটেরাদের ব্যাকডোর দিয়ে আবারও ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনতেই এই বিশেষ ধারাটি তৈরি করা হয়েছিল। তীব্র সমালোচনার মুখে অবশেষে সরকার এটি বাতিলের ঘোষণা দিল।একীভূত হওয়া পাঁচটি সংকটাপন্ন শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী জানান, ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর ব্যক্তিগত আমানতকারীরা তাদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে আপাতত এককালীন সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত তুলতে পারবেন। অবশিষ্ট অর্থ ধাপে ধাপে গ্রাহকদের বুঝিয়ে দেওয়া হবে। তবে ক্যান্সার ও কিডনি ডায়ালাইসিস রোগী, হজ সঞ্চয়কারী এবং ডিপিএস গ্রাহকদের জরুরি প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে বিশেষ মানবিক সুবিধা বা অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। অন্যদিকে, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে অর্থ বিলে একগুচ্ছ বড় সংশোধনীর ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এর মধ্যে জিরো কুপন বন্ড থেকে প্রাপ্ত আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত করা, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য বিশেষ করছাড়ের সুবিধা, ব্যাংকিং চ্যানেলে সব ধরনের লেনদেন সম্পন্ন করা কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত কর রেয়াত দেওয়া, শেয়ারের লভ্যাংশের ওপর বিদ্যমান করের হার কমানো এবং মিউচুয়াল ফান্ডে কর রেয়াত পাওয়ার জন্য এতদিনের থাকা পাঁচ লাখ টাকার ঊর্ধ্বসীমা পুরোপুরি তুলে দেওয়া অন্যতম।অর্থনৈতিক অপরাধ দমনের খতিয়ান তুলে ধরে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, গত মে মাস পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বড় জاليةতির মামলায় দেশে ও বিদেশে প্রায় ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে ইতোমধ্যে ১৩টি দেশে ২৩টি ‘মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট’ (এমএলএআর) পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ব্যাংকিং খাত ধসিয়ে দেওয়া দেশের শীর্ষস্থানীয় বড় ছয়টি ঋণগ্রহীতা করপোরেট গ্রুপের বিরুদ্ধে প্রথম ধাপে দেওয়ানি আইনি কার্যক্রম শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বাজেট কাঠামোর পরিবর্তন প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার এখন ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বের হয়ে বিনিয়োগনির্ভর টেকসই কাঠামোর দিকে যাচ্ছে। সে লক্ষ্যে আগামী অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা গত বছরের তুলনায় ৬ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়েছে। একই সঙ্গে ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎসে কর কমানো এবং বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।বাংলাদেশের ইতিহাসে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্যাংকিং খাতে নজিরবিহীন অনিয়ম, বেনামি ঋণ ও অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেশ কয়েকটি বেসরকারি ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ জোরপূর্বক দখল করে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের কারণে পুরো আর্থিক খাত দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন ও অবসায়নের জন্য ‘ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন’ অত্যন্ত যুগান্তকারী একটি পদক্ষেপ ছিল। তবে আইনটিতে পুরোনো মালিকদের ফেরার সুযোগ রাখা সংক্রান্ত ১৮(ক) ধারাটি যুক্ত করায় সুশাসন প্রতিষ্ঠার সদিচ্ছা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছিল। সরকারের এই পিছুহটা এবং ধারাটি বাতিলের সিদ্ধান্তকে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক ও বড় রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল