প্রিন্ট এর তারিখ : ২৯ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৯ জুন ২০২৬
রাজনীতির নতুন সমীকরণে কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ?
আহমেদ রিয়াদ , নিউজ এডিটর ||
চব্বিশের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট বা স্থায়ী রূপ ধারণ করতে পারেনি। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশে সাধারণ নির্বাচন এবং গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও, বিজয়ী রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কারের রূপরেখা ও তা বাস্তবায়নের সময়সীমা নিয়ে নানামুখী বিতর্ক চলছে। এর মধ্যেই আবার ক্ষমতাচ্যুত অপশক্তিগুলোও রাজনীতিতে পুনর্বাসনের জন্য নানা কৌশলে মাথাচাড়ার চেষ্টা করছে।শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা থেকে আইনের শাসনভিত্তিক একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে উত্তরণের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা এখনো চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন জাগে—আমরা কি বর্তমান রাজনৈতিক রূপান্তরের সফল সমাপ্তির অপেক্ষায় আছি, নাকি দেশ আরেকটি নতুন রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকে ধাবিত হচ্ছে? তবে বড় প্রশ্ন এটি নয় যে পরবর্তী রূপান্তরটি কবে ঘটবে; বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, দুই বছর আগের সেই অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থান থেকে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো আসলে কী শিক্ষা নিতে পেরেছে।২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ছিল দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে অভাবনীয় ও ব্যতিক্রমী একটি ঘটনা। দেশের মূল ধারার প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কাছেও এই পরিবর্তনের গতিপ্রকৃতি ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। ফলে একটি জনবিরোধী, মাফিয়া-তান্ত্রক শাসনের অবশিষ্টাংশ পুরোপুরি নির্মূল করে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য যে ধরনের পূর্বপ্রস্তুতি ও রাজনৈতিক স্থাপত্যের প্রয়োজন ছিল, তার ঘাটতি স্পষ্ট লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, চব্বিশের ছাত্র-জনতার আন্দোলন গত আট দশকের চেনা রাজনৈতিক পরিবর্তনের চেনা ছকটিকে পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছে।ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ প্রতি দুই দশক পর পর বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। ১৯৪৭ সালে মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের জন্মের মাত্র ২৪ বছরের মাথায় ১৯৭১ সালে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এর ঠিক দুই দশক পর, ১৯৯০ সালে ছাত্র-জনতার তীব্র গণ-আন্দোলনে পতন ঘটে এক সামরিক স্বৈরাচারের। ১৯৯১ সালে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হলেও, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের ফলে তা দুই বছরের জন্য স্থগিত হয়ে যায়। পরবর্তীতে ২০১১ সালে সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করার মাধ্যমে দেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর সুবাদে শেখ হাসিনা ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে তিনটি চরম বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখেন, যার অবসান ঘটে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তাঁর ভারতে পালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে।এর আগেও দেশের রাজনীতিতে নানা উত্থান-পতন ও দিক-পরিবর্তন হয়েছে। স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল ক্রমান্বয়ে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হয় এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সামরিক অভ্যুত্থানে তাঁর হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। এরপর বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন জেনারেল জিয়াউর রহমান, যিনি ১৯৮১ সালের ৩০ মে আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন। এরপর নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে হটিয়ে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ ক্ষমতা দখল করেন জেনারেল এইচ এম এরশাদ। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জয়ী হলেও, ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের তীব্র আন্দোলনের মুখে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করে তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে ২০০১ সালের নির্বাচনে আবার আওয়ামী লীগকে পরাজিত করে বিএনপি ক্ষমতায় আসে।সম্প্রতি ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিজয়ী দল বিএনপির সাথে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকা জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির রাজনৈতিক বাদানুবাদ দেখে অনেক পর্যবেক্ষকই রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের পুনরুত্থানের সম্ভাবনা খুঁজছেন। তবে তাঁরা যে বিষয়টি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন তা হলো, হাসিনা সরকারের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির চরম প্রত্যাখ্যান দেশের রাজনৈতিক আদর্শকে বাম-ঘেঁষা অবস্থান থেকে সম্পূর্ণভাবে মধ্য-ডানপন্থার (Centre-Right) দিকে ধাবিত করেছে।২০২৬ সালের নির্বাচন দেশের রাজনীতিতে এই নতুন মূলধারার উত্থানকে চূড়ান্তভাবে সিলমোহর দিয়েছে এবং ঐতিহাসিকভাবে মধ্য-বামপন্থী দল হিসেবে পরিচিত, বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ প্রান্তিক শক্তিতে পরিণত করেছে। শেখ হাসিনার দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনের আগে, যেকোনো প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সম্মিলিতভাবে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ vote পেত। কিন্তু ২০২৬ সালের প্রাক-নির্বাচন জরিপগুলোতে দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ ভোটারই এখন বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ-বিরোধী শিবিরের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন।এক সময় সমস্ত বিরোধী মতকে নির্মমভাবে দমন করে শেখ হাসিনা দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। কিন্তু সেই দুঃশাসনের অবসান ঘটাতে দেশের সাধারণ মানুষকে সর্বোচ্চ মূল্য দিতে হয়েছে; জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে নারী ও শিশুসহ ১,৫০০-র বেশি মানুষ শহীদ হয়েছেন এবং প্রায় ৩০,০০০ মানুষ পঙ্গুত্ব ও ক্ষত নিয়ে বেঁচে আছেন।১৯১৭ সালের রাশিয়া, ১৯৪৯ সালের চীন কিংবা ১৯৭৯ সালের ইরানের বিপ্লবের মতো চব্বিশের এই রূপান্তরে কোনো একক দল বা নেতার করিশমা ছিল না; এটি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব গণজাগরণ। ৫ আগস্টের পর দেশে কোনো বিপ্লবী সরকার গঠিত হয়নি, বরং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন একটি রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কার এজেন্ডা এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব নেয়। কিন্তু বর্তমানে নির্বাচন-পূর্ব সেই রাজনৈতিক সখ্যতা এবং 'জুলাই সনদে'র চেতনা যখন কেবলই রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর ও বিতর্কের বিষয়ে পরিণত হচ্ছে, তখন বলাই বাহুল্য যে ২০২৪-এর এই বিপ্লব তার চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি, অর্থাৎ এটি এখনো এক 'অসমাপ্ত বিপ্লব'।ক্ষমতার মূল দাবিদার দলগুলো দেশের এই নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের আকাঙ্ক্ষা ও স্পন্দন কতটা পড়তে পারছে—তা এখনো নিশ্চিত নয়। ৫ আগস্টের সেই ঐতিহাসিক বিজয়ের স্মৃতি তরুণেরা ভুলে যায়নি। তাদের সেই আকাঙ্ক্ষা ও ত্যাগের যদি যথাযথ মূল্যায়ন না হয়, তবে এই তরুণ প্রজন্মই দেশের রাজনৈতিক গতিপথ বদলে দিতে আবারও রাজপথে নেমে আসতে দ্বিধা করবে না। সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়ভার তাই এখন সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর কোর্টেই রয়ে গেছে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল