প্রিন্ট এর তারিখ : ২৯ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৯ জুন ২০২৬
ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসের মুখে ৫ হাজার বছরের ঐতিহ্য
শামিমা লিয়া, আন্তর্জাতিক ডেস্ক এডিটর ||
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে প্রায় চার মাস ধরে চালানো ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে দেশটির শতাব্দী প্রাচীন অসংখ্য ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহ্যবাহী স্থান ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় থাকা প্রাচীন টায়ার নগরী থেকে শুরু করে শত বছরের পুরোনো ক্রুসেডার দুর্গ ও মামলুক আমলের প্রাচীন বাজার—সবকিছুই এখন ইসরায়েলি বোমা হামলায় লণ্ডভণ্ড। লেবাননের সংস্কৃতি মন্ত্রী ঘাসান সালামে বিষয়টিকে দেশটির ইতিহাস ও ঐতিহ্য মুছে ফেলার একটি 'পদ্ধতিগত ধ্বংসযজ্ঞ' বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।লেবাননের সংস্কৃতি মন্ত্রী ঘাসান সালামে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, এক সপ্তাহ আগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ইসরায়েলি বাহিনী এখনো লেবাননের অভ্যন্তরে প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীর সীমান্ত এলাকা দখল করে রেখেছে। ফলে ওইসব দুর্গম ও অবরুদ্ধ এলাকায় গিয়ে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র এখনো পুরোপুরি নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।সালামে বলেন, "দখলদারিত্বের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আমাদের পক্ষে কাজ করা অসম্ভব।" তিনি জানান, ইসরায়েলি বাহিনীর বুলডোজার সীমান্ত অঞ্চলের বেশ কিছু প্রাচীন গ্রামকে আক্ষরিক অর্থেই মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে, যেখানে শত বছর ধরে খ্রিষ্টান, শিয়া ও সুন্নি মুসলমানরা একসাথে বসবাস করে আসছিলেন এবং সেখানে তাদের প্রাচীন উপাসনালয়গুলো অবস্থিত ছিল।যুদ্ধ চলাকালীন ইসরায়েলের তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ ঘোষণা করেছিলেন যে, লেবানন সীমান্তের সমস্ত বাড়িঘর ধ্বংস করে দেওয়া হবে। সংস্কৃতি মন্ত্রীর মতে, এই আগ্রাসনের ফলেই মধ্যযুগীয় বোফোর্ট দুর্গ (Beaufort Castle), টায়ার এবং নাবাতিয়াহর মতো প্রাচীন শহরগুলো বিমান হামলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নাবাতিয়াহ শহরের ঐতিহাসিক মামলুক আমলের বাজারটি বোমার আঘাতে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ক্রুসেডার আমলের তেবতিন দুর্গটিও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।বর্তমান লেবানন মূলত ফিনিশীয়, বাইজান্টাইন, মামলুক এবং ক্রুসেডার সভ্যতার এক ঐতিহাসিক মিলনস্থল। প্রায় ৫ হাজার বছরের প্রাচীন টায়ার শহরটি এবং এর রোমান ধ্বংসাবশেষ এই সমৃদ্ধ ইতিহাসেরই সাক্ষী। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের আক্রমণের সময় মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত হওয়া এই ঐতিহাসিক শহরটি অতীতে অনেক যুদ্ধ-বিগ্রহ থেকে বেঁচে গেলেও, এবারের ইসরায়েলি হামলায় এর সিংহভাগই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোকে বোমার আঘাত থেকে বাঁচাতে যেসব সুরক্ষাপ্রাচীর বা ব্যারিয়ার দেওয়া হয়েছিল, বিস্ফোরণের তীব্রতায় সেগুলোই উল্টো প্রাচীন মোজাইক ও স্তম্ভগুলোর ওপর ভেঙে পড়েছে। লেবাননের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কর্মকর্তা আদনান ইস্তানবুলি আক্ষেপ করে বলেন, "ক্ষয়ক্ষতির গভীরতা দেখলে মনে হবে যেন নিচ থেকে কোনো শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটেছে বা কোনো তীব্র ভূমিকম্প পুরো এলাকাটিকে ওলটপালট করে দিয়েছে।" টায়ারের উপ-মেয়র আলওয়ান শরাফউদ্দীন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে সুরক্ষিত এবং যেকোনো সংঘাতের ঊর্ধ্বে থাকার কথা থাকলেও এই প্রাচীন শহরটিকে নির্মমভাবে নিশানা করা হয়েছে।এদিকে, বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় থাকা এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোর সুরক্ষায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো (UNESCO)। তারা চামার দুর্গ ও বোফোর্ট দুর্গের চারপাশে চলা যুদ্ধকে সাংস্কৃতিক সম্পদের ওপর 'বেআইনি আক্রমণ' বলে নিন্দা জানিয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় লেবানন সরকার টায়ার শহরকে 'ঝুঁকিতে থাকা বিশ্ব ঐতিহ্য' (World Heritage Site in Danger) হিসেবে ঘোষণা করার জন্য ইউনেস্কোর কাছে আবেদন জানিয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এর সুরক্ষায় আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়।যদিও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি, তারা বেসামরিক অবকাঠামোর ক্ষতি করতে চায় না এবং কেবল 'সামরিক প্রয়োজনে' কঠোর নিয়ম মেনেই এই হামলাগুলো চালিয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র এবং লেবানন সরকারের অভিযোগ ইসরায়েলের এই দাবিকে পুরোপুরি নাকচ করে দিচ্ছে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল