প্রিন্ট এর তারিখ : ২৮ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৮ জুন ২০২৬
স্মার্টফোনেই হবে রক্ত পরীক্ষা সুসংবাদ দিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিজ্ঞানী
তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক ||
আঙুলের ছাপ কিংবা মুখ স্ক্যান করে স্মার্টফোনের স্ক্রিন আনলক করার প্রযুক্তি এখন আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। তবে কেমন হতো যদি আঙুলের ডগায় শুধু ক্যামেরা ধরেই শরীরের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যতথ্য জেনে নেওয়া যেত? ল্যাবরেটরিতে না গিয়ে, কোনো ধরনের সুই বা সিরিঞ্জ ছাড়াই যদি শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা, কিংবা ভবিষ্যতে রক্তের শর্বরা, হিমোগ্লোবিন ও ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা মাপা সম্ভব হতো? শুনতে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি মনে হলেও এই অসম্ভবকে বাস্তবে রূপ দিতে চলেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. শেখ ইকবাল আহমেদ.বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মারকুয়েট ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন ড. শেখ ইকবাল আহমেদ। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি ও এলসেভিয়ারের যৌথ তালিকা অনুযায়ী বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ প্রভাবশালী বিজ্ঞানীদের অন্যতম এই গবেষকের লক্ষ্য হলো—স্মার্টফোনকে মানুষের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসেবা প্ল্যাটফর্মে পরিণত করা, যেখানে রক্ত পরীক্ষার জন্য আর কোনো সুই ফোটানোর প্রয়োজন হবে না। তাঁর গবেষণাগারের উদ্ভাবিত এই বিশেষ প্রযুক্তির নাম ‘ইউবিহোয়াইট’ (Ubwhite), যা ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিকভাবে পেটেন্ট লাভ করেছে এবং প্রাথমিক পরীক্ষায় দারুণ সাফল্য দেখিয়েছে।ড. ইকবাল আহমেদের এই উদ্ভাবনে মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ইমেজ প্রসেসিং এবং সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংকে কাজে লাগানো হয়েছে। ইউবিহোয়াইট প্রযুক্তিতে একটি ব্লু-লাইট ফিল্টারযুক্ত স্মার্টফোন ক্যামেরা, এলইডি ফ্ল্যাশলাইট এবং একটি ছোট চুম্বক ব্যবহার করা হয়। প্রথমে এই বিশেষ আলো ও ক্যামেরার সাহায্যে আঙুলের ডগার ক্ষুদ্র রক্তনালির একটি ভিডিও ধারণ করা হয় এবং চুম্বকের সাহায্যে রক্তপ্রবাহের সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্যগুলো বিশ্লেষণ করা হয়। পরবর্তীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই ভিডিও ফ্রেম-বাই-ফ্রেম বিশ্লেষণ করে রক্তপ্রবাহে শ্বেত রক্তকণিকার উপস্থিতির কারণে ঘটা সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো শনাক্ত করে এবং এর সঠিক সংখ্যা অনুমান করে।গবেষণাগারে প্রাথমিক পর্যায়ে ২০ জন রোগীর ওপর এই পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, এর ফলাফল প্রচলিত ল্যাবরেটরি পরীক্ষার অত্যন্ত কাছাকাছি। বর্তমানে আরও বড় পরিসরে এর কার্যকারিতা যাচাই করতে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া ক্যানসার সেন্টারের সহযোগিতায় ২০০ জন রোগীর তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং একই সাথে বাংলাদেশের গবেষকদের সঙ্গেও এর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। ক্যানসার, লিউকেমিয়া, লিম্ফোমা এবং শরীরের যেকোনো গুরুতর সংক্রমণ শনাক্ত করতে শ্বেত রক্তকণিকার সঠিক সংখ্যা জানা অত্যন্ত জরুরি। এই যুগান্তকারী গবেষণাটি ইতিমধ্যেই ‘নেচার সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ এবং ‘আইইইই’ (IEEE)-এর মতো বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর প্রায় ১০০ কোটিরও বেশি কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট (সিবিসি) পরীক্ষা করা হয়, যার প্রতিটিতে গড়ে প্রায় ৩০ ডলার খরচ হয়। এই প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে সফল হলে সাধারণ মানুষ ঘরে বসেই নামমাত্র খরচে নিয়মিত নিজের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে পারবেন এবং প্রয়োজনে ডিজিটাল রিপোর্ট সরাসরি চিকিৎসকের কাছে পাঠাতে পারবেন। এতে হাসপাতালের দীর্ঘ লাইন এবং যাতায়াতের ভোগান্তি যেমন কমবে, তেমনি বাঁচবে বিপুল অর্থ। এই প্রযুক্তিকে বিশ্বব্যাপী মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ড. আহমেদ ‘ইউবিভাইটাল’ (Ubvital) নামে একটি স্টার্টআপ কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা ইতিমধ্যে আড়াই লাখ মার্কিন ডলারের সিড ফান্ডিং পেয়েছে এবং হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের বুটক্যাম্পে নির্বাচিত হয়েছে।উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিশেষ করে গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলে আধুনিক ল্যাবরেটরি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অভাব একটি বড় সমস্যা। সামান্য রক্ত পরীক্ষার জন্য রোগীদের মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে জেলা শহর বা রাজধানীর হাসপাতালে আসতে হয়। ড. শেখ ইকবাল আহমেদের এই সিরিঞ্জবিহীন ব্যথামুক্ত প্রযুক্তি চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রথাগত ধারণাকে বদলে দিতে পারে। যদিও গবেষকদের মতে, এই প্রযুক্তি এখনই ল্যাবরেটরি টেস্টের সম্পূর্ণ বিকল্প নয়; তবে এটি প্রাথমিক ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের জন্য একটি বৈপ্লবিক ও সাশ্রয়ী মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে, যা বিশ্বের প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসা প্রাপ্তিকে আরও সহজলভ্য করে তুলবে।সূত্র: মারকুয়েট টুডে ডটকম
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল