প্রিন্ট এর তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬
ভয়াবহ ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ, আশঙ্কা ৩–৪ লাখ প্রাণহানির
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
ফিলিপাইন ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঘটনাগুলো এ অঞ্চলের ভূ-তাত্ত্বিক ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে পরপর কয়েকদিন মৃদু কম্পন অনুভূত হওয়ার ঘটনাটি সাধারণ মানুষের মধ্যে বড় ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছে। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, এই ছোট কম্পনগুলো বড় কোনো দুর্যোগের নিশ্চিত সংকেত নয়, তবে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও ভূ-প্রাকৃতিক গঠনের কারণে একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঝুঁকি কোনোভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ভূ-তাত্ত্বিকদের দীর্ঘদিনের গবেষণায় উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশ এমন এক ভূমিকম্পপ্রবণ বলয়ে অবস্থিত যেখানে যে কোনো সময় বড় ধরনের ভূকম্পন আঘাত হানতে পারে।বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, রাজধানী ঢাকায় যদি ছয় থেকে সাত মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে, তবে তা অভাবনীয় মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। তাদের মতে, এক্ষেত্রে মূল বিপদের কারণ ভূমিকম্পের মাত্রা নয়, বরং ঢাকার অপরিকল্পিত নগরায়ন ও দুর্বল অবকাঠামো। প্রকৌশলবিদ্যার একটি বহুল প্রচলিত সত্য হলো, ভূমিকম্প নিজে মানুষকে মারে না, বরং দুর্বল ভবনই প্রাণহানির প্রধান কারণ। নির্মাণবিধি উপেক্ষা করে গড়ে ওঠা অসংখ্য বহুতল ভবন, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার এবং সরকারি তদারকির ঘাটতি সামগ্রিক ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকায় সাত মাত্রার ভূমিকম্প হলে প্রায় বাহাত্তর হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে, যা কয়েক লাখ মানুষের প্রাণহানির মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে সক্ষম।ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবেই ভূমিকম্পের পুনরাবৃত্তিমূলক চক্রের মধ্যে রয়েছে। অতীতে আঠারোশ সাতানব্বই সালে ডাউকি ফল্টে আট দশমিক এক মাত্রার এবং এর আগে ও পরে আরও বেশ কয়েকটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। গবেষকদের মতে, দেড়শ থেকে দুইশ বছরের একটি চক্র বিবেচনা করলে এখন বাংলাদেশ বড় ধরনের কম্পনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে ময়মনসিংহের ডাউকি ফল্ট, আরাকান ফল্ট এবং সিলেট থেকে কাছাড় পর্যন্ত বিস্তৃত প্লেট বাউন্ডারিগুলো বর্তমানে অত্যন্ত সক্রিয় অবস্থায় আছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সাত থেকে সাত দশমিক পাঁচ মাত্রার একটি ভূমিকম্প যে কোনো সময় আঘাত হানতে পারে।রাজধানীর প্রায় ২১ লাখ স্থাপনার মধ্যে প্রায় ছয় লাখ বহুতল পাকা ভবনের অন্তত চল্লিশ শতাংশই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। অথচ এই বিপুলসংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্তকরণ ও সেগুলোকে সংস্কারের কোনো নির্দিষ্ট তালিকা বা কার্যকর পরিকল্পনা আজও দৃশ্যমান নয়। বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় যে প্রস্তুতি প্রয়োজন, তার ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে। এখন সময় এসেছে নির্মোহ বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করার, নির্মাণবিধি কঠোরভাবে কার্যকর করার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির। যদি এখনই এ ব্যাপারে সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হয়, তবে ভবিষ্যতে একটি বড় ভূমিকম্প দেশের জন্য অপূরণীয় ও ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে, যা জাতীয় অর্থনীতি ও জনজীবনে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষত সৃষ্টি করবে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল