প্রিন্ট এর তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬
বাংলাদেশের অগ্রগতিতে সবচেয়ে বড় অন্তরায় আইনশৃঙ্খলা
মোঃ রফিকুল ইসলাম , স্টাফ রিপোর্টার ||
একটি রাষ্ট্রকে সাফল্যের শিখরে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে উপাদানটি সবচেয়ে জরুরি, তা হলো স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার মাহাথির মোহাম্মদ তার শাসনামলের শুরুতেই এটি অনুধাবন করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, কঠোর শৃঙ্খলা ছাড়া কোনো জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা বা স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। পশ্চিমা বিশ্বের সমালোচনা সত্ত্বেও তিনি অপরাধ দমনে আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। সেই কঠোরতাই আজ মালয়েশিয়াকে বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করেছে। বিশ্বের প্রতিটি সফল রাষ্ট্রের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা অভ্যন্তরীণ অপরাধ দমন করে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে, যা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের মূল চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মাহাথির মোহাম্মদের এই দর্শন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও অনুকরণীয়।২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশের মানুষ এক নতুন স্বপ্ন দেখেছিল—শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের স্বপ্ন। শিক্ষার্থীরা চেয়েছিল শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ, ব্যবসায়ীরা চেয়েছিলেন ভীতিমুক্ত পরিবেশে বিনিয়োগের নিশ্চয়তা। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। ৫ আগস্টের পর থেকে দেশে এক চরম নৈরাজ্যের সূচনা হয়, যা জনমনে গভীর আতঙ্ক তৈরি করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সচিবালয়, এমনকি বিচারালয় ও ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতেও মব বা উচ্ছৃঙ্খল গোষ্ঠীর রাজত্ব কায়েম হয়েছিল। সাধারণ মানুষ নিজ বাড়িতেও নিজেদের অনিরাপদ মনে করতে শুরু করে। এই অস্থিতিশীল পরিবেশ দেশের শিক্ষার মান, সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ভিত্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের হার বেড়ে যাওয়ায় দেশের মানুষ এক গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হয়।জনগণের তীব্র দাবির মুখে বর্তমান সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনাকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছে। গত তিন মাসে পরিস্থিতির কিছু উন্নতি হলেও, তা জনগণের প্রত্যাশা পূরণে এখনো যথেষ্ট নয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ সিভিল রাইটস সোসাইটির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। চলতি বছরের শুরু থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের যে পরিসংখ্যান উঠে এসেছে, তা ইঙ্গিত দেয় যে আমরা এখনো দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথে পৌঁছাতে পারিনি। হাজারো খুন, অপহরণ, ডাকাতি ও নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনা দেশের ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রমাণ দিচ্ছে।তবে সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও, প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে থাকা কিছু জটিলতা পরিস্থিতি উন্নতির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিগত সরকারের আমলে প্রশাসনে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপর্যায়ে বিএনপিবিরোধী যে বলয় তৈরি করা হয়েছিল, তাদের অনেকেই এখনো নিজ নিজ অবস্থানে বহাল আছেন। এই অংশটি সরকারের যেকোনো ভালো উদ্যোগকে ব্যর্থ করার জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। একই অবস্থা বিচার বিভাগের ক্ষেত্রেও। গত সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া আইন কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ এখনো দায়িত্বে থেকে সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলার চেষ্টা করছেন, যার প্রমাণ ২৩ জুন অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় থেকে ১৮ জন আইন কর্মকর্তার পদত্যাগ। তাদের এই পদত্যাগ সরকারকে একটি বড় ধরনের সতর্কবার্তা দিয়ে গেছে।আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির টেকসই উন্নতির জন্য আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। বিগত সরকারের আমলে হওয়া অপরাধের বিচারের পাশাপাশি বর্তমান সরকারের দায়িত্ব হলো জুলাই-পরবর্তী সময়ে সংঘটিত চাঁদাবাজি, মব সন্ত্রাস, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা। বিনিয়োগ পরিবেশ ফেরাতে হলে যারা শিল্পকারখানায় আগুন দিয়েছে কিংবা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতেই হবে। সম্প্রতি ধানমন্ডি বত্রিশের সামনে সাংবাদিক নির্যাতনের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রমাণ করে যে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি কখনোই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসবে না।সরকার বিপুল জনসমর্থন নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, তাই তাদের কারো প্রতি দুর্বলতা দেখানোর কোনো অবকাশ নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারকে হতে হবে নির্মোহ ও সাহসী। অপরাধীর কোনো দলীয় পরিচয় নেই—সে অপরাধীই। সরকার যদি দলীয় আনুগত্য বা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই দেশ কাঙ্ক্ষিত শান্তির পথে ফিরে আসবে। অন্যথায় উন্নয়ন পরিকল্পনা ও সমৃদ্ধির স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। দেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রশাসনিক ও বিচারিক জটিলতা কাটিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করাই এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল