প্রিন্ট এর তারিখ : ২৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৫ জুন ২০২৬
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায় মধ্যস্থতা করে কী পেল পাকিস্তান?
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
সুইজারল্যান্ডের মাটিতে যখন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের ভূয়সী প্রশংসা করছিলেন, তখন বিশ্ব রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা নতুন করে সমীকরণ মেলাতে শুরু করেন। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দুই বৈরী শক্তির মধ্যে দীর্ঘদিনের জমে থাকা বরফ গলাতে নেপথ্যের কারিগর হিসেবে যে ইসলামাবাদ কাজ করেছে, তা এখন আর গোপন নয়। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তীব্র অর্থনৈতিক সংকট ও দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা পাকিস্তান কেন অন্যের ঝামেলার মীমাংসায় এতটা ঝুঁকি নিল এবং এই কূটনৈতিক তৎপরতায় তাদের নিজস্ব পকেটে আদতে কী এল?যুদ্ধ এবং কঠোর নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যখন সংঘাতের চূড়ান্ত প্রান্তে উপনীত, ঠিক তখনই ত্রাতা হিসেবে সামনে আসে পাকিস্তান। ট্রাম্প প্রশাসন যখন কোনো পক্ষকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না, তখন পাকিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব হয়ে ওঠে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার প্রধান সেতুবন্ধন। পর্দার আড়ালের এই কার্যকর দূতিয়ালির কারণেই গত সপ্তাহে দুই পক্ষ একটি শান্তির রোডম্যাপে পৌঁছাতে সমর্থ হয়েছে। এই উদ্যোগের প্রতিদান হিসেবে ইরান ও পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কও নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে, যার প্রমাণ মিলেছে ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে ইসলামাবাদকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তে।সুইজারল্যান্ডের বৈঠকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মন্তব্য ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি রসিকতাচ্ছলে নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দুই ব্যক্তির কথা বলতে গিয়ে ভারতীয় বংশোদ্ভূত স্ত্রীর পাশাপাশি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের প্রশংসা করেন। গত তিন মাসে মার্কিন প্রশাসন যে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে সবচেয়ে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রেখেছে, ভ্যান্সের বক্তব্যে তা স্পষ্ট। ওয়াশিংটন থেকে তেহরান পর্যন্ত সব পক্ষের হিসাব-নিকাশে পাকিস্তান এখন এক অপরিহার্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজের অবস্থান পুনরুদ্ধার করেছে।তবে এই ভূ-রাজনৈতিক চালের পেছনে পাকিস্তানের নিজস্ব স্বার্থও নিহিত রয়েছে। দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিংবা ৩০ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্সের কিছুটা স্বস্তি থাকলেও, অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ক্ষত এখনো গভীর। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণ কর্মসূচির মধ্যে থাকা পাকিস্তানের জন্য এই শান্তি চুক্তি বড় ধরনের অর্থনৈতিক অক্সিজেন হতে পারে। হরমুজ প্রণালীর উত্তেজনা প্রশমিত হলে জ্বালানি আমদানির ব্যয় হ্রাস পাবে, যা পাকিস্তানের মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে। দীর্ঘ এক দশক ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভয়ে ঝুলে থাকা ইরান-পাকিস্তান গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পটি এবার আলোর মুখ দেখার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা দেশটির জ্বালানি সংকট নিরসনে বড় ভূমিকা রাখবে।অর্থনৈতিক স্বার্থের পাশাপাশি এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা। এই মধ্যস্থতার মাধ্যমে পাকিস্তান বিশ্বমঞ্চে নিজের হারানো আঞ্চলিক গুরুত্ব নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিশরের মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সাথে সমন্বয় করে পাকিস্তান নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোর একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। এতে পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থান আরও সংহত হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের অকুণ্ঠ প্রশংসা প্রমাণ করে যে, ওয়াশিংটনের কাছে পাকিস্তানের বেসামরিক সরকারের চেয়ে সামরিক সদর দপ্তরের চাবিকাঠিই সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য।ভূ-রাজনীতির এই বিশাল নাটকে পাকিস্তান আপাতদৃষ্টিতে সফল হলেও বিশ্লেষকরা সতর্কবার্তা উচ্চারণ করছেন। নাইন ইলেভেনের পরবর্তী পরিস্থিতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তারা বলছেন, অতীতেও অনেক কূটনৈতিক হাততালি মিললেও তা দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট দূর করতে পারেনি। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই ঐতিহাসিক অর্জনের সুফল যদি দুই দশক ধরে সশস্ত্র বিদ্রোহ ও দারিদ্র্যে জর্জরিত বেলুচিস্তানের প্রান্তিক মানুষের কাছে না পৌঁছায়, তবে এই সাফল্য কেবল ক্ষমতার অলিন্দে থাকা এলিটদের আরেকটি চমৎকার কূটনৈতিক চমক হিসেবেই রয়ে যাবে। দিনশেষে এই মধ্যস্থতা পাকিস্তানকে বিশ্বমঞ্চে বাহবা দিলেও, দেশটির নিজস্ব ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং সামাজিক অস্থিরতা নিরসনে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল