প্রিন্ট এর তারিখ : ২৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৫ জুন ২০২৬
ভাঙন আতঙ্কে দক্ষিণ উপকূল, ঝুঁকিতে দীর্ঘ বেড়িবাঁধ
মোঃ রফিকুল ইসলাম , স্টাফ রিপোর্টার ||
উপকূলীয় জনপদগুলোতে এখন চরম আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে জরাজীর্ণ বেড়িবাঁধ। নদীর করাল গ্রাসে কোথাও দেখা দিয়েছে বিশাল ফাটল, আবার কোথাও বাঁধের অংশবিশেষ ধসে বিলীন হচ্ছে নদীগর্ভে। যেকোনো মুহূর্তে বাঁধ ভেঙে লবণাক্ত পানিতে তলিয়ে যেতে পারে বিস্তীর্ণ এলাকা, এই ভয়ে খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী ইউনিয়নের ঝপঝপিয়া নদীপাড়ের হাজারো মানুষের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। বর্ষার উত্তাল ঢেউ আর জোয়ারের প্রবল চাপে প্রতিদিনই এই ঝুঁকির মাত্রা বাড়ছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনকে করে তুলেছে চরম অনিশ্চিত।খুলনার দাকোপের বাসিন্দা রোকেয়া বেগমের মতো অনেকেরই এখন ভাঙনই যেন নিত্যসঙ্গী। গত পাঁচ বছরে তিনবার নদীভাঙনের কবলে পড়ে ভিটেমাটি হারিয়েছেন তিনি, অনেক কষ্টে নতুন করে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলেও এখন আবার বাঁধের ভাঙন সেই পুরনো আতঙ্ক ফিরিয়ে এনেছে। রাতে নদীভাঙনের শব্দ শুনলে আঁতকে ওঠেন তিনি। কেবল পানখালী নয়, দাকোপের জাবেরের খেয়াঘাট, লক্ষ্মীখোলা ও নলডাঙ্গাসহ প্রায় ১০টি ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে পাইকগাছার দেলুটি ও লতা ইউনিয়ন এবং কয়রার মহেশ্বরীপুরেও। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, কেবল খুলনা জেলাতেই প্রায় ৪০ কিলোমিটার বাঁধ এখন চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে।স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙনকবলিত এসব এলাকায় বছরের পর বছর ধরে কেবল নামমাত্র মেরামত বা সাময়িক সংস্কার কাজ করা হয়। কিন্তু জোয়ারের তোড় আর দুর্যোগের ধাক্কায় কিছুদিন পরই পরিস্থিতি আবার আগের মতো ভয়াবহ হয়ে ওঠে। আব্দুল গফুর নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, জোয়ারের সময় চোখের পলক ফেলতে পারেন না তারা, কারণ বাঁধ ভেঙে গেলে তাদের শেষ সম্বল ঘের, ফসলি জমি আর বসতবাড়ি সবই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। আংইন বা আম্পানের মতো ঘূর্ণিঝড়ের দুঃসহ স্মৃতি এখনো তাড়া করে বেড়ায় এখানকার মানুষকে, আকাশ মেঘলা দেখলেই তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন।কেবল খুলনা নয়, পাশ্ববর্তী বাগেরহাটের শরণখোলা এবং সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নগুলোতেও ভাঙনের কবলে পড়েছে প্রায় ৬০ কিলোমিটারের বেশি বেড়িবাঁধ। উপকূলীয় অঞ্চলের এই সংকট নিরসনে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বিবেচনায় না নিয়ে অপরিকল্পিত নকশায় বাঁধ নির্মাণের ফলেই দীর্ঘমেয়াদে কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাতের মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ বাড়ায় উপকূল সুরক্ষায় প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পরিকল্পনা, যা কেবল মেরামত বা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।এসব সংকট মোকাবিলায় খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জহির মাজহার জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পাশাপাশি টেকসই ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য কয়েকটি বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে মোট দুই হাজার কিলোমিটারের বেশি বেড়িবাঁধ রয়েছে, যার একটি বিশাল অংশ নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের দাবি রাখে।উপকূলীয় রক্ষায় প্রতিবছর শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও নদীপাড়ের মানুষের মনে প্রশ্ন থেকেই যায়, তাদের এই দুর্ভোগের অবসান কবে ঘটবে। বর্ষা মৌসুম এলেই বাঁধ টিকবে কি টিকবে না—এই সংশয় আর দুশ্চিন্তা উপকূলীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে স্থবির করে দেয়। তাই কেবল সাময়িক সংস্কার বা মেরামতের বৃত্তে বন্দী না থেকে, মানুষের স্বপ্ন আর জীবিকা রক্ষায় টেকসই ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল