প্রিন্ট এর তারিখ : ২৪ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৪ জুন ২০২৬
কাজের সংকট ও অর্থাভাব, ৪৫৭ কারখানার ৮৬ শতাংশ স্থায়ীভাবে বন্ধ
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
আর্থিক টানাপোড়েন ও নানাবিধ সংকটের মুখে পড়ে সম্প্রতি গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকার ইউনিক ডিজাইনার্স অ্যান্ড ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় দুই হাজার ২০০ কর্মকর্তা ও কর্মচারী কর্মসংস্থান হারিয়েছেন, যাদের মধ্যে শ্রমিক রয়েছেন এক হাজার ৭০০ জন। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ জুন থেকে কারখানাটির উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। তবে মালিকপক্ষের সঙ্গে শ্রম ও শিল্প সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের পর শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও চাকরির শর্ত অনুযায়ী আইনানুগ পাওনা আগামী ২৭ জুলাইয়ের মধ্যে পরিশোধের একটি সমঝোতা হয়েছে।গাজীপুরের এই ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন দৃষ্টান্ত নয়, বরং দেশের শিল্প খাতে চলমান অস্থিরতার একটি চিত্র মাত্র। শিল্প গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত দেশের সাতটি প্রধান শিল্পাঞ্চলে মোট ৪৫৭টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, কারখানা বন্ধের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছে ক্রয়াদেশের অভাব এবং মালিকপক্ষের তীব্র আর্থিক সংকট। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর মধ্যে ২০৫টি বন্ধ হয়েছে পর্যাপ্ত ওয়ার্কঅর্ডারের অভাবে এবং ১৯০টি বন্ধ হয়েছে মালিকদের আর্থিক দৈন্যদশার কারণে। অর্থাৎ, মোট বন্ধ হওয়া কারখানার প্রায় ৮৬ দশমিক ৪৩ শতাংশেরই মূল সমস্যা ছিল বাজার চাহিদা ও মূলধনের অভাব। এর বাইরে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ১১টি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যাংক জটিলতা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, কাঁচামাল প্রাপ্তিতে বাধার মতো অন্যান্য কারণে ৫১টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।শিল্প পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ মালিকপক্ষ শ্রম আইন মেনেই নোটিস দিয়ে কারখানা বন্ধ করছেন। কিন্তু জটিলতা তৈরি হচ্ছে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের ক্ষেত্রে। নিয়ম অনুযায়ী নোটিস দিয়ে বন্ধের প্রক্রিয়াটি আইনসিদ্ধ হলেও, কারখানা কর্তৃপক্ষ অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, সার্ভিস বেনিফিটসহ অন্যান্য পাওনা বুঝিয়ে দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন। এতেই মূলত শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম হয় এবং পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন পড়ে। এছাড়া কারখানা বন্ধের বিষয়টি আগেভাগে শ্রমিকদের না জানানোয় হঠাৎ তৈরি হওয়া অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তোলে।এ বিষয়ে শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি গাজী জসীম উদ্দিন জানান, কারখানাগুলো নোটিস দিয়ে বন্ধ করলেও পাওনা পরিশোধে বিলম্বই শ্রমিক অসন্তোষের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই নির্ধারিত সময়ে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হচ্ছে না, যা শিল্পের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ। তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান বের করার জন্য শিল্প পুলিশকে অনেক সময় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে হয়, যদিও এটি তাদের মূল দায়িত্বের বাইরের বিষয়। আগে থেকে তথ্য থাকলে এই ধরনের উত্তপ্ত পরিস্থিতি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হতো।দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, মোট ১০ হাজার ২৩৮টি কারখানার মধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে বন্ধের হার ভিন্ন। সবচেয়ে বেশি কারখানা বন্ধ হয়েছে গাজীপুরে, যেখানে দুই হাজার ৭৬৪টির মধ্যে ১৫৫টি বন্ধ হয়ে গেছে। এরপরই রয়েছে আশুলিয়া, যেখানে এক হাজার ৭০৫টি কারখানার মধ্যে ১২৪টি বন্ধ হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রামে ১১৯টি, নারায়ণগঞ্জে ৩৮টি, ময়মনসিংহে আটটি, খুলনায় ছয়টি এবং কুমিল্লায় সাতটি কারখানা বন্ধের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে সিলেট অঞ্চলে এমন কোনো কারখানার তথ্য পাওয়া যায়নি।বন্ধ হওয়া ৪৫৭টি কারখানার মধ্যে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে বিজিএমইএ-এর সদস্য ১০৮টি, বিকেএমইএ-এর সদস্য ৩৫টি এবং বিটিএমএ-এর সদস্য আটটি কারখানা রয়েছে। এছাড়া বেপজা’র আওতাধীন ১৯টি এবং কোনো সংগঠনের সদস্য নয় এমন ২৮৭টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। সামগ্রিকভাবে, স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়া কারখানার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি সরাসরি তৈরি পোশাক ও বস্ত্র শিল্পের সঙ্গে জড়িত।শিল্প খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তারা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদী ক্রয়াদেশ সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা এবং কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি উদ্যোক্তাদের টিকে থাকার সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। যদিও সরকার এই বিপর্যস্ত শিল্পগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছে, তবে তা যথেষ্ট কি না—সেটি এখন বড় প্রশ্ন। বিজিএমইএ’র তথ্যমতে, প্রণোদনা পাওয়ার আশায় ৩২২টি কারখানা আবেদন করেছে, যার মধ্যে ১৯৯টি পুরোপুরি এবং ১২৩টি আংশিক বন্ধ রয়েছে।বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ জানান, এই সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। অর্ডার ঘাটতি থেকে শুরু হওয়া সমস্যাটি পরে ব্যাংকিং জটিলতা ও এলসি খোলার সংকটে রূপ নিয়েছে। এর সঙ্গে জ্বালানি ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতি যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান যোগ করেন, প্রতিটি কারখানার পরিস্থিতি ভিন্ন। তাই সব কারখানাকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক হবে না। তারা তৃতীয় পক্ষের অডিটের মাধ্যমে প্রকৃত সংকটগ্রস্ত কারখানাগুলো চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়ার চেষ্টা করছেন।পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে ঢালাও নীতি গ্রহণ না করে ‘টার্গেটিং’ বা বাছাই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেসব কারখানা অনেক বছর ধরে বন্ধ সেগুলোর পরিকাঠামো ব্যবহারের অনুপযোগী হতে পারে, তাই সবগুলোকে সহায়তার আওতায় না এনে যেগুলোর ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা আছে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, সহায়তার আগে থার্ড পার্টি অডিটের মাধ্যমে কারখানার বাস্তব অবস্থা যাচাই করে একটি কার্যকর রিকভারি রোডম্যাপ তৈরি করা জরুরি।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল