প্রিন্ট এর তারিখ : ২৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৪ জুন ২০২৬
ফ্যাব্রিকেশন বাদ দিয়ে চিপ ডিজাইনে বিশ্ববাজার ধরতে চায় বাংলাদেশ
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
ব্যয়বহুল ও জটিল ‘ওয়েফার ফ্যাব্রিকেশন’ বা চিপ উৎপাদন প্ল্যান্টের প্রতিযোগিতায় না গিয়ে সেমিকন্ডাক্টর খাতের অন্য তিন উচ্চ-মূল্যের ক্ষেত্র—চিপ ডিজাইন, টেস্টিং ও প্যাকেজিংয়ে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করার কৌশল নিয়েছে বাংলাদেশ। বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর ভ্যালু চেইনে দ্রুত প্রবেশ করতে এই সুচিন্তিত ও মেধাকেন্দ্রীক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এই খাতের বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘ এক দশকের নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সরকারের পক্ষ থেকে বড় ধরনের সমর্থন মিলেছে।সরকার সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের প্রসারে নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত কাস্টমস ডিউটি (আমদানি শুল্ক) ও ভ্যাটে (মূসক) বড় ছাড় নিশ্চিত করেছে। এই বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে ইলেকট্রনিক ডিজাইন অটোমেশন (ইডিএ) টুলস, প্রোপ্রাইটরি সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন সফটওয়্যার, উন্নত প্যাকেজিং যন্ত্রপাতি এবং বিশেষায়িত টেস্টিং সরঞ্জামের ওপর। খাত সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মতে, এই দীর্ঘমেয়াদি ছাড়ের ফলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে ব্যবসার প্রসারের জন্য একটি বড় ধরনের নিশ্চয়তা ও আস্থা পেয়েছে।বর্তমানে বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ ডিজাইন খাত থেকে বার্ষিক মাত্র ৮ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় করে। নতুন এই আর্থিক ও নীতিগত সুবিধার মূল লক্ষ্য হলো, ২০৩০ সালের মধ্যে এই আয়কে ১ বিলিয়ন ডলারের একটি শক্তিশালী রপ্তানি খাতে রূপান্তর করা। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) দেওয়া তথ্যমতে, ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট (আইসি) ডিজাইন, আউটসোর্সড সেমিকন্ডাক্টর অ্যাসেম্বলি অ্যান্ড টেস্টিং (ওস্যাট) এবং অত্যাধুনিক গবেষণা ও উন্নয়নে (আরঅ্যান্ডডি) দেশি-বিদেশি বড় পুঁজি আকর্ষণ করাই এই মহাপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআইএ) সভাপতি এম এ জব্বার একে এই খাতের অন্যতম যুগান্তকারী নীতিগত সিদ্ধান্ত বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, ওয়েফার ফ্যাব্রিকেশনের জন্য বিপুল মূলধন বিনিয়োগ ও কয়েক দশকের প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রয়োজন হয়। তাই আপাতত সেই জটিল পথে না হেঁটে বাংলাদেশের সামনে আইসি ডিজাইন, ডিজাইন ভেরিফিকেশন, এফপিজিএ ও এমবেডেড সিস্টেমস, সেমিকন্ডাক্টর টেস্টিং এবং প্যাকেজিং ইঞ্জিনিয়ারিং সেবার মতো ক্ষেত্রগুলোতে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার দারুণ সুযোগ রয়েছে।বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের অধ্যাপক এবং বিডার জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর টাস্কফোর্সের সদস্য এ বি এম হারুন-অর-রশিদ জানান, শুল্ক-ভ্যাট কমায় চিপ ডিজাইনের সঙ্গে যুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, স্টার্টআপ ও তরুণ উদ্যোক্তাদের খরচ অনেকটাই কমবে। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো প্রকৌশল মেধা। দেশে প্রতি বছর প্রায় ১৩ হাজার ইইই গ্র্যাজুয়েট এবং প্রায় ২৬ হাজার কম্পিউটার সায়েন্স গ্র্যাজুয়েট তৈরি হচ্ছে, যা চিপ ডিজাইনের জন্য একটি বিশাল ‘ট্যালেন্ট পুল’ বা মেধার জোগান দিচ্ছে।বৈশ্বিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান গার্টনারের তথ্যমতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং ফাইভজি প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান চাহিদায় ভর করে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজার ২০২৬ সালের মধ্যে ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে; যা ২০৩০ সাল নাগাদ ১.৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববাজারের এই বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশও ২০৩০ সালের মধ্যে চিপ ডিজাইন খাত থেকে তাদের বর্তমান রপ্তানি আয় ১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার দূরদর্শী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এই অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে দেশের সেমিকন্ডাক্টর অবকাঠামোকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার আওতায় চলতি দশকের শেষ নাগাদ দেশে অন্তত ৫০টি চিপ ডিজাইন ফার্ম, ৩টি আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর টেস্টিং কেন্দ্র এবং ২টি বিশেষায়িত প্যাকেজিং শিল্প কেন্দ্র স্থাপন করা হবে।টাস্কফোর্সের রোডম্যাপ অনুযায়ী, স্বল্পমেয়াদে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, মধ্যমেয়াদে টেস্টিং ও প্যাকেজিং এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে ওয়েফার ফ্যাব্রিকেশনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এই কৌশল ইতিমধ্যে বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের উলকাসেমি, নিউরাল সেমিকন্ডাক্টর, প্রাইম সিলিকন টেকনোলজি এবং সিলিকনোভা-র মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের চিপ ডিজাইন ও ইঞ্জিনিয়ারিং সেবা দিচ্ছে।সিলিকনোভার পরিচালক ও টেকনিক্যাল প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. শাফিল হোসাইন জানান, বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা ইতিমধ্যেই ১৮০ ন্যানোমিটার থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক ২ ন্যানোমিটার টেকনোলজি নোডের চিপ ডিজাইন প্রকল্পে সফলভাবে কাজ করছেন। চিপ আর্কিটেকচার, ডিজাইন ও ভেরিফিকেশনের এই প্রাথমিক কিন্তু উচ্চ-মূল্যের ক্ষেত্রগুলোতে বাংলাদেশ এখনই বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে সম্পূর্ণ সক্ষম।নীতিগত গতিশীলতা থাকলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু প্রণোদনা দেওয়াই এই খাতের জন্য যথেষ্ট নয়। অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ উল্লেখ করেন, গ্র্যাজুয়েটদের চিপ শিল্পের উপযোগী করে তুলতে প্রায় এক বছরের বিশেষায়িত ‘ভেরি লার্জ স্কেল ইন্টিগ্রেশন’ (ভিএলএসআই) প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়। জটিল চিপ ডিজাইন প্রকল্পে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো অভিজ্ঞ প্রকৌশলীর ঘাটতি দূর করতে তিনি ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ তৈরি এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর দাবি জানান।পাশাপাশি, বিএসআইএর সভাপতি এম এ জব্বার এই খাতে পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম গড়তে উন্নত টেস্টিং ল্যাব, গবেষণার জন্য বিশেষ তহবিল, শক্তিশালী মেধাস্বত্ব (আইপি) সুরক্ষা আইন এবং হাই-টেক পার্কগুলোতে ভাড়া-মুক্ত জমি বরাদ্দের ওপর জোর দিয়েছেন।বৈশ্বিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান গার্টনারের তথ্যমতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বৈদ্যুতিক যানবাহন ও ফাইভজি প্রযুক্তির চাহিদায় ভর করে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজার ২০২৬ সালের মধ্যে ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১.৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। এই বিশাল বাজারে আঞ্চলিক প্রতিযোগী হিসেবে ভারত তাদের সেমিকন্ডাক্টর মিশনের আওতায় ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে, ভিয়েতনাম ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাত থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে। এই তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যেও ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ চিপ ডিজাইন, ভেরিফিকেশন ও টেস্টিং সাপোর্টের ক্ষেত্রে একটি অন্যতম আঞ্চলিক হাবে পরিণত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা দেখছে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল