প্রিন্ট এর তারিখ : ২৩ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৩ জুন ২০২৬
ব্রেক্সিটের ধাক্কায় টালমাটাল ব্রিটিশ রাজনীতি
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের ঐতিহাসিক বিদায় বা ব্রেক্সিট নামক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তটি শুধু সেই জোটকেই খণ্ডিত করেনি, বরং ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থা ও রাজনীতিকে এক দীর্ঘস্থায়ী ধ্বংসযজ্ঞের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ২০১৬ সালের ২৩ জুনের সেই বহুল আলোচিত গণভোটে দেশটির ৫২ শতাংশ মানুষ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করার পক্ষে এবং ৪৮ শতাংশ মানুষ থেকে যাওয়ার পক্ষে রায় দিয়েছিল। চার দশকেরও বেশি সময় পর নেওয়া সেই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের এক দশক পূর্ণ হওয়ার দিনে এসে যুক্তরাজ্য আজ এক চরম রাজনৈতিক শূন্যতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাদের সপ্তম প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ব্রেক্সিট নামক এই গণভোটের ডাক দিয়েছিলেন তৎকালীন কনজারভেটিভ দলের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। তিনি নিজে অবশ্য জোটের ভেতরে থাকার পক্ষেই জোরালো প্রচার চালিয়েছিলেন, কিন্তু ভোটের ফলাফল তার বিরুদ্ধে যাওয়ায় নৈতিক পরাজয় স্বীকার করে পরদিনই তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। সেই যে ব্রিটেনের রাজনৈতিক অস্থিরতার শুরু, তা গত এক দশকে কেবল আরও ঘনীভূতই হয়েছে।ক্যামেরনের পর ডাউনিং স্ট্রিটে যারাই এসেছেন, তারা প্রত্যেকেই এই ঐতিহাসিক বিচ্ছেদের ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিণতি সামাল দিতে গিয়ে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন। সর্বশেষ নাটকীয়তার অংশ হিসেবে লেবার পার্টির প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার গত সোমবার মাত্র দুই বছর ক্ষমতায় থাকার পর আকস্মিকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। মূলত এক স্থবির ও অলস অর্থনীতি, সরকারি কার্যকারিতার চরম ব্যর্থতা এবং একটি মারাত্মকভাবে বিভক্ত ও ক্লান্ত ভোটার গোষ্ঠীর চাপ সামলাতে না পেরেই তিনি বিদায় নিতে বাধ্য হন। এই সমস্ত সংকটের পেছনে সুপ্তভাবে জড়িয়ে রয়েছে ব্রেক্সিটের রেখে যাওয়া নেতিবাচক উত্তরাধিকার। এই বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে গবেষণা করা বিশ্লেষকদের মতে, ব্রেক্সিট হয়তো এখন আর প্রতিদিন পত্রিকার মূল শিরোনাম হচ্ছে না, তবে এর ফলে তৈরি হওয়া অভ্যন্তরীণ গভীর ক্ষত ও রক্তক্ষরণ ব্রিটেনের বর্তমান অশান্ত রাজনীতির মধ্য দিয়ে এখনও প্রতিনিয়ত প্রবাহিত হচ্ছে।এই বিচ্ছেদের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল এক ধরণের কৃত্রিম অসন্তোষ এবং কাল্পনিক অতীতের প্রতি মানুষের আবেগ ও ব্যাকুলতা। ব্রেক্সিটপন্থি নেতারা সাধারণ মানুষের সামনে এই প্রতিশ্রুতি ফেরি করেছিলেন যে, আটাশটি দেশের এই বিশাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্লক থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে যুক্তরাজ্য তাদের নিজস্ব আইন, অর্থনীতি এবং ভৌগোলিক সীমান্তের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবে। যখন থেকে যাওয়ার পক্ষের মানুষজন সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরছিলেন, তখন বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষের দলটি মানুষের জাতীয়তাবাদী আবেগকে খুব চতুরতার সাথে পুঁজি করে। ব্রেক্সিটের প্রধান কাণ্ডারি এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী হওয়া বরিস জনসন তো গণভোটের ঠিক আগে এমনও দাবি করেছিলেন যে, তারা এক আলোকিত ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছেন এবং এই সুযোগ হাতছাড়া করা হবে এক চরম বোকামি। ইতিহাসবিদদের মতে, মানুষ এটিকে অবাধ অভিবাসন এবং বহিরাগত নিয়মের বিরুদ্ধে এক ধরণের জেদ হিসেবে দেখেছিল। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল একটি ভ্রান্ত নস্টালজিয়া, যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাকি ব্রিটেন একাই লড়েছিল, যা ঐতিহাসিকভাবে সত্য ছিল না। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় ছিল, এই বিচ্ছেদের ফলে বাস্তবে ঠিক কী ঘটতে যাচ্ছে, তার কোনো স্পষ্ট রূপরেখা কখনোই জনগণের সামনে ব্যাখ্যা করা হয়নি।পরবর্তীতে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ব্রিটিশ সরকার সবাইকে চরমভাবে অসন্তুষ্ট করেছে। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, নতুন বাণিজ্য চুক্তি, জনকল্যাণে বিপুল অর্থ বরাদ্দ আর জটিল নিয়মকানুনের অবসান ঘটানোর যে সাহসী স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তা দ্রুতই বাস্তবতার কঠিন দেয়ালে ধাক্কা খায়। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে চলা চরম তিক্ত ও জটিল দরকষাকষির পর ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে জোট ত্যাগ করে এবং আরও এগারো মাসের একটি অন্তর্বর্তী সময় পার করে চূড়ান্তভাবে আলাদা হয়। ডেভিড ক্যামেরনের পর দায়িত্ব নেওয়া থেরেসা মে একটি খণ্ডিত ও বিভক্ত পার্লামেন্টের কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো বিদায়ী শর্ত বা চুক্তি উপস্থাপন করতে না পেরে ২০১৯ সালে কাঁদতে কাঁদতে বিদায় নেন। তার জায়গায় এসে বরিস জনসন যেকোনো মূল্যে ব্রেক্সিট সম্পন্ন করার স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় বসেন এবং একটি দায়সারা গোছের চুক্তি করতে সমর্থ হলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে ব্রিটেনের সম্পর্ককে এক শীতল ও স্থবির অবস্থায় রেখে যান।ক্রমাগত আর্থিক অনিয়ম ও নৈতিক কেলেঙ্কারির দায়ে ২০২২ সালে কনজারভেটিভ পার্টি জনসনকে ক্ষমতাচ্যুত করলে লিজ ট্রাস দায়িত্ব নেন, যিনি মাত্র ঊনপঞ্চাশ দিন টিকতে পেরেছিলেন। এরপর ঋষি সুনাক এসে সম্পর্কের বরফ কিছুটা গলালেও মৌলিক কোনো পরিবর্তন আনতে পারেননি। কিয়ার স্টারমার ক্ষমতা গ্রহণের সময় সম্পর্ক নতুন করে সাজানোর কথা বললেও জোটের শুল্কমুক্ত একক বাজারে পুনরায় যোগ দেওয়ার বিষয়টি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে স্টারমার যখন ক্ষমতা হস্তান্তর করছেন, তখনও ব্রেক্সিট একটি অসমাপ্ত এবং অমীমাংসিত ক্ষত হিসেবেই রয়ে গেছে। দলীয় স্তরে এই বিভক্তি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইউরোপের সাথে সম্পর্ক কেমন হবে সেই বিতর্ক দূর করার আশায় গণভোটের ডাক দেওয়া হলেও তা কনজারভেটিভ পার্টিকে চিরতরে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। যারা জোটের সাথে নরম বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতে চেয়েছিলেন, তাদের দল থেকে নির্মমভাবে বের করে দেওয়া হয়। অন্য দিকে লেবার পার্টি ঐতিহ্যগতভাবে জোটপন্থি হলেও দলের ভেতরে গভীর ফাটল রয়েছে। সাধারণ ভোটাররা এখন এই দুই প্রধান দলের ওপর আস্থা হারিয়ে গ্রিন পার্টি বা নাইজেল ফারাজের চরমপন্থি রিফর্ম ইউকের মতো বিকল্প দলের দিকে ঝুঁকছেন। নাইজেল ফারাজকে বলা যায় ব্রেক্সিটের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী, যিনি প্রথমে বিচ্ছেদের পক্ষে উন্মাদনা তৈরি করেন এবং পরে ব্রেক্সিটের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে বলে শোরগোল তোলেন। তার অভিবাসনবিরোধী বার্তা এখন সাধারণ মানুষের মন জয় করছে এবং জনমত জরিপে তার দল ক্রমাগত এগিয়ে চলেছে।বিগত এক দশকে ব্রিটেনের অর্থনীতিকে যে চরম লড়াই করতে হচ্ছে, তার অন্যতম প্রধান অনুঘটক এই ব্রেক্সিট। এর ফলে ব্যবসায়ীরা তাদের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশীদের সাথে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন শুল্ক ও আমলাতান্ত্রিক বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। যদিও এই অর্থনৈতিক ধীরগতির পেছনে বিশ্বব্যাপী মহামারি, রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিও আংশিক দায়ী। দুঃখজনক বিষয় হলো, দেশটির ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদরা কখনো জনগণের সামনে এসে অকপটে সত্য বলতে পারেননি যে, কর বা ঋণ না বাড়িয়ে রাতারাতি উন্নত জনসেবা দেওয়া অসম্ভব। ফলে মানুষ মারাত্মকভাবে আশাহত হয়েছে। ব্রেক্সিট যে অভিবাসন বিতর্ক কমানোর জন্য করা হয়েছিল, তা কমাতে তো পারেইনি বরং এই বিতর্ককে আরও সহিংস করে তুলেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো বিভিন্ন মিথ্যা রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে উসকানিদাতারা ব্রিটেনের রাস্তায় ব্যাপক অভিবাসনবিরোধী সহিংসতা ও দাঙ্গা ছড়িয়ে দিয়েছে। অতীতের সুশীল রাজনৈতিক আলোচনা এবং রাস্তার প্রকাশ্য সহিংসতার মাঝখানে যে একটি দৃঢ় সীমানা প্রাচীর ছিল, ব্রেক্সিটের হাত ধরে সেই দেওয়াল এখন সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে।বর্তমানে যুক্তরাজ্যের সাধারণ মানুষের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে এক তীব্র অনুশোচনা ও অনুতাপের আবহ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক এক বিশ্বস্ত জরিপে দেখা গেছে, দেশের প্রায় বায়ান্ন শতাংশ মানুষ এখন পুনরায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফিরে যেতে চান এবং মাত্র তেত্রিশ শতাংশ এর বিরোধিতা করছেন। এমনকি কিছুদিন আগেও সেন্ট্রাল লন্ডনের রাস্তায় শত শত মানুষ নীল ও হলুদ রঙের জোটের পতাকা উড়িয়ে পুনরায় যোগদানের দাবিতে বিশাল মিছিল করেছেন। তবে ব্রেক্সিটের সেই উত্তাল সময়ের তুলনায় এই জমায়েত কিছুটা ছোট ছিল, কারণ একটি বড় অংশ এখন ক্লান্ত হয়ে এই তিক্ত অধ্যায় ভুলে সামনে এগিয়ে যেতে চায়। কিন্তু ব্রেক্সিট এখন এমন এক রাজনৈতিক ল্যান্ডমাইনে পরিণত হয়েছে, যা স্পর্শ করতে সব দলের নেতারাই আতঙ্ক বোধ করেন। তাছাড়া ব্রিটেন যদি কোনোদিন ফিরে যেতেও চায়, তবে অত্যন্ত সতর্ক ও সন্দিহান ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে ফিরে যাওয়ার সেই পথটি হবে দীর্ঘ, জটিল এবং অত্যন্ত অপমানজনক। যতক্ষণ না ব্রিটেনের রাজনীতিবিদরা এই রূঢ় সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস দেখাচ্ছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত দেশটি এক দীর্ঘস্থায়ী সংকটের আবর্তেই ঘুরপাক খাবে। এটি যেন একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং ক্ষয়কারী রোগ, যা নিরাময়যোগ্য হলেও রোগীরা ডাক্তারের কাছে যেতে ভয় পাচ্ছে, কারণ তারা জানে যে সেই চিকিৎসার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক হবে।উৎস: এপি ।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল