প্রিন্ট এর তারিখ : ২২ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২২ জুন ২০২৬
বিদেশে উচ্চশিক্ষায় বাংলাদেশিদের ব্যয় বেড়েছে তিন গুণের বেশি, ছয় বছরে বড় উত্থান
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
উচ্চ শিক্ষার সন্ধানে প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী দেশ ছাড়ার ফলে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দশ মাসেই বিদেশে উচ্চ শিক্ষার পেছনে ব্যয় হয়েছে প্রায় তিয়াত্তর কোটি ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় নয় হাজার কোটি টাকারও বেশি। বর্তমান ধারা বজায় থাকলে অর্থবছর শেষে এই ব্যয়ের পরিমাণ এক বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, এই বিশাল অংকের অর্থ দেশের ৫৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সরকার কর্তৃক বার্ষিক বরাদ্দের চেয়েও বেশি। ইউজিসির তথ্যমতে, প্রায় তিন লাখ শিক্ষার্থীর উচ্চ শিক্ষার জন্য যেখানে সরকার বছরে প্রায় দশ হাজার আটশ দুই কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে, সেখানে শিক্ষার্থীরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে পড়াশোনার জন্য দেশের বাইরে এর চেয়েও বেশি অর্থ ব্যয় করছে।বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে ব্যাংকিং চ্যানেলে বিদেশে অর্থ পাঠানোর হার জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে যেখানে এই ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ২১ কোটি ৮০ লাখ ডলার, তা মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তিন গুণেরও বেশি বেড়ে বর্তমানে ৭৩ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরী মনে করেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় মানসম্মত সুযোগ-সুবিধার অভাব এবং নীতিনির্ধারকদের অদূরদর্শিতা এর প্রধান কারণ। তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে, দেশীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি না করা এবং শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে মেধাবীদের দেশ ছাড়ার এই প্রবণতা কোনোভাবেই কমানো সম্ভব নয়। বর্তমানে এমন কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে যার ফলে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলেও বেশি শিক্ষার্থীকে সুযোগ দিতে পারছে না, ফলে শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে বিদেশমুখী হচ্ছে।শিক্ষার্থীদের বিদেশ গমনের গন্তব্য হিসেবে বর্তমানে মালয়েশিয়া অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ইএমজিএসের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে দেশটিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মতো দেশগুলোতেও বাংলাদেশিদের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। ইউনেস্কোর তথ্য বলছে, গত এক দশকে বিদেশগামী শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। এর নেপথ্যে কেবল উচ্চ শিক্ষা নয়, বরং স্থায়ীভাবে বসবাসের আকাঙ্ক্ষাও বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। অনেক শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষাকে কেবল বিদেশ যাওয়ার একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছেন এবং পড়াশোনা শেষে তাদের বড় একটি অংশ আর দেশে ফিরছেন না।এর পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো দেশের শ্রমবাজারের বর্তমান নাজুক অবস্থা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশের উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের প্রায় ৫৮ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন এবং উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি, যা প্রায় তেরো শতাংশের কাছাকাছি। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেনের মতে, দেশে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও শিক্ষার অভাব এবং উচ্চ শিক্ষিতদের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থানের অভাবই তরুণদের বিদেশমুখী করছে। তিনি মনে করেন, অন্তত হাতেগোনা কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা এবং মেধাবীদের জন্য নিরাপদ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা না গেলে এই মেধাপাচার রোধ করা অসম্ভব। বুয়েটের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরীর মতে, বর্তমান আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে তরুণরা দেশে কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছেন না বলেই তারা যেকোনো উপায়ে দেশ ত্যাগ করতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। শিক্ষার মানের চেয়েও বড় কারণ এখন রাষ্ট্রের সামগ্রিক পরিবেশ ও জীবনের নিরাপত্তা, যা না থাকায় মেধাবীরা অনিশ্চয়তার হাত থেকে বাঁচতে বিদেশের পথে পা বাড়াচ্ছেন।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল