প্রিন্ট এর তারিখ : ২১ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২১ জুন ২০২৬
সংঘাতের বাস্তবতায় ইসরায়েলের দাপট নিয়ে নতুন প্রশ্ন
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
সাম্প্রতিক সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি মন্তব্য ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা ও তাদের টিকে থাকার নেপথ্যের আসল চিত্রটি নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। ট্রাম্প সরাসরি বলেছেন, তার শাসনামলে নেওয়া পদক্ষেপ বা সহায়তার ওপরই ইসরায়েলের অস্তিত্ব টিকে আছে। তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন যে, তিনি না থাকলে ইসরায়েলকে হয়তো ইরানের হামলার মুখে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে হতো। এই বক্তব্য ইসরায়েলের সামরিক শক্তির অজেয় হওয়ার যে মিথ বা কৃত্রিম দাপট দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বজুড়ে প্রচার করা হতো, তাকে কার্যত ভেঙে দিয়েছে। মার্কিন সহায়তার ওপর ইসরায়েলের এই চরম পরনির্ভরশীলতা এখন আর কোনো গোপন বিষয় নয়, বরং বাস্তবতার নির্মম আয়নায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যের একটি অপরাজেয় সামরিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, তাদের যুদ্ধ পরিচালনার পুরো সক্ষমতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরবরাহ এবং কৌশলী সহায়তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে এই সত্যটিই ফুটে উঠেছে যে, ইসরায়েলের কাছে থাকা অত্যাধুনিক বি-২ বোমারু বিমান থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম—সবই যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন। ট্রাম্পের দাবি, এই অস্ত্রভাণ্ডার ও চুক্তির পুরোটাই তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকার কারণেই ইসরায়েল নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারছে। অর্থাৎ, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর তথাকথিত ‘স্বয়ংসম্পূর্ণতা’ কেবলই একটি রাজনৈতিক আবরণ, যার অন্তরালে রয়েছে মার্কিন প্রশাসনের প্রত্যক্ষ ও সর্বাত্মক মদত।বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলের বিভিন্ন যুদ্ধের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাদের যুদ্ধবিমান বা মিসাইল রক্ষণাবেক্ষণের মতো মৌলিক কাজের জন্যও মার্কিন প্রযুক্তিবিদ ও যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভর করতে হয়। গাজায় যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা ইসরায়েলে পাঠিয়েছে, তা থেকেই প্রমাণিত হয় যে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় তারা নেই। এমনকি তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অকার্যকর হয়ে পড়া এবং দীর্ঘ পাল্লার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সীমাবদ্ধতাগুলো মার্কিন জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানের সাহায্য ছাড়া পুরোপুরি কাটানো অসম্ভব। ফলে এটি স্পষ্ট যে, মার্কিন সহায়তার পথ বন্ধ হলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভিত নড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের মধ্যে যে বাহ্যিক মতপার্থক্য বা নাটকীয় বিরোধ দেখা যাচ্ছে, তা মূলত একটি কৌশলগত কৌশলের অংশ হতে পারে। তবে এই কৌশলের আড়ালে থাকা সত্যটি হলো, মার্কিন করদাতাদের অর্থে পরিচালিত এই সামরিক সহায়তা ছাড়া ইসরায়েলের টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। খোদ মার্কিন রাজনীতিক ও বিশ্লেষকরা এখন প্রশ্ন তুলছেন যে, আর কতদিন এভাবে অন্যের অর্থে একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখা হবে। মার্কিন রাজনৈতিক ধারাভাষ্যকার টাকার কার্লসন ও আনা কাসপারিয়ানের মতো ব্যক্তিত্বরা সরাসরি সামরিক সহায়তা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সহায়তা প্রত্যাহার করলেই ইসরায়েলের প্রকৃত সামরিক দুর্বলতা ও পতন সামনে চলে আসবে।সবশেষে বলা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই স্বীকারোক্তি কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির একটি কঠিন বাস্তবতাকে উন্মোচন করেছে। ইসরায়েলকে ঘিরে গড়ে তোলা সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের যে দেয়াল, তা মূলত মার্কিন সহায়তার খুঁটিতে দাঁড়িয়ে আছে। সেই খুঁটি দুর্বল হলে বা সরে গেলে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হবে, তা ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। তাই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখন ইসরায়েলকে আর অজেয় ভাবার কোনো সুযোগ নেই, বরং এই রাষ্ট্রটি যে পুরোপুরি বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরশীল এক কৃত্রিম কাঠামো, তা আজ সারাবিশ্বের সামনে প্রমাণিত।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল