প্রিন্ট এর তারিখ : ২১ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২১ জুন ২০২৬
হামলা ঠেকাতে গিয়ে বিপত্তি, নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্রেই আক্রান্ত রাশিয়া
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে সম্প্রতি ইউক্রেনের চালানো বড় আকারের ড্রোন হামলা দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। গত ১৮ জুন ভোরের এই আক্রমণকে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর মস্কোর ওপর এযাবৎকালের সবচেয়ে ভয়াবহ ড্রোন হামলা হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই ঘটনার সময় মস্কোর রাস্তায় যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি দেখা গেছে, তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ফুটেজে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে। ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, ব্যস্ত মহাসড়কের ওপর রুশ সেনারা কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে আকাশে থাকা ড্রোনের ওপর গুলি ছুড়ছেন, অথচ সেই সময়েই সাধারণ মানুষের যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক ছিল। সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে দৌড়াদৌড়ি করছিল এবং একটি ড্রোন বাজারের কাছে একটি বহুতল ভবনের ওপর আছড়ে পড়ে।এই হামলার আরেকটি মর্মান্তিক দৃশ্য হলো, একটি রুশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র তার লক্ষ্যবস্তু ভেদ করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে উল্টো একটি তেল সংরক্ষণাগারে গিয়ে আঘাত হানে। এতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে এবং আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। এই ঘটনাকে অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা ‘রাশিয়ার আত্মঘাতী গোল’ বা নিজেদের ভুলে নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া হিসেবে অভিহিত করেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউক্রেন এখন খুব সুপরিকল্পিতভাবে কৌশল পরিবর্তন করেছে। তারা একসঙ্গে প্রচুর সংখ্যক ড্রোন পাঠিয়ে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চরম চাপের মুখে ফেলে দিচ্ছে, ফলে রুশ বাহিনীর পক্ষে সবকটি ড্রোন শনাক্ত ও ধ্বংস করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক মার্কাস শিলার জানিয়েছেন, রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সব সময় শতভাগ নির্ভুল নয়, অথচ ইউক্রেন তাদের আক্রমণ সক্ষমতাকে ক্রমাগত উন্নত করে চলেছে।বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মূলত যুদ্ধবিমান, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা ক্রুজ মিসাইল মোকাবিলার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল, ছোট ও কম উচ্চতায় চলাচলকারী ড্রোন বা ড্রোনের ঝাঁক ধ্বংস করার জন্য নয়। লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক থমাস উইথিংটনের মতে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া আধুনিক প্রযুক্তি সংগ্রহের ক্ষেত্রে ব্যাপক সংকটে রয়েছে, যা তাদের নতুন ধরনের এই ড্রোন হুমকি মোকাবিলার সামর্থ্যকে সীমিত করে দিয়েছে। ম্যাকেনজি ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসেসের বিশ্লেষক স্টু রে-র মতে, মস্কোর রাস্তায় যে অগোছালো ও অপেশাদার প্রতিরক্ষা তৎপরতা দেখা গেছে, তা রাশিয়ার সামরিক দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ। এই পরিস্থিতি মস্কোর মতো জনবহুল শহরে নাগরিকদের নিরাপত্তা ও সামরিক কৌশলের অকার্যকারিতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।ড্রোন হামলার এই ক্রমবর্ধমান প্রভাব কেবল সামরিক স্থাপনাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এটি রাশিয়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে। গত মে মাসে মস্কোর রেড স্কোয়ারে বিজয় দিবসের সামরিক কুচকাওয়াজ ছোট করতে বাধ্য হয়েছিল রাশিয়া, যেখানে আগের মতো ভারী সামরিক সরঞ্জাম প্রদর্শিত হয়নি। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় একে ‘বর্তমান অপারেশনাল পরিস্থিতি’ বলে অভিহিত করলেও বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত আকাশপথের নিরাপত্তার অভাবেই ঘটেছে। এখন রাশিয়ার সামরিক পরিকল্পনাকারীদের সামনে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে তাদের খুঁজে বের করতে হচ্ছে কোন পথে এগোলে তারা সবচেয়ে কম ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হবে।সূত্র: সিএনএন।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল