প্রিন্ট এর তারিখ : ২০ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২০ জুন ২০২৬
মোহাম্মদপুরে অপরাধের বিস্তার, সক্রিয় ৫০টির বেশি চক্র
মোঃ রফিকুল ইসলাম , স্টাফ রিপোর্টার ||
দেশের প্রতিটি প্রান্তে এখন চাঁদাবাজির যে ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে, তা সাধারণ মানুষের জীবনকে এক অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছে। ফুটপাতের ক্ষুদ্র বিক্রেতা থেকে শুরু করে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার, নৌ-ঘাট কিংবা পরিবহন সেক্টর—এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে এই চাঁদাবাজির অভিশপ্ত ছায়া পড়েনি। একসময় চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ মূলত শীর্ষ সন্ত্রাসী বা মাফিয়া গোষ্ঠীগুলোর হাতে থাকলেও, বর্তমানে সেই পরিধি এতই বিস্তৃত হয়েছে যে ছোটখাটো অপরাধীরাও এতে জড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শ্যামলী এলাকা বর্তমানে এক চরম আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত চাঁদার দাবিতে হয়রানি, মারধর ও হুমকির শিকার হচ্ছেন। বাড়ি নির্মাণ থেকে শুরু করে ব্যবসা পরিচালনা, এমনকি মাছ ধরা পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে চাঁদা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে ভুক্তভোগীদের। চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করতে গিয়ে রাজনৈতিক কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।সম্প্রতি মৌচাক এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করতে গিয়ে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক এক নেতা প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুর এলাকায় ফুটপাত ও পরিবহন সেক্টরের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে প্রতিপক্ষের গুলিতে প্রাণ দিতে হয়েছে স্থানীয় এক ব্যক্তিকে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরবর্তী সময়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডের বহু শীর্ষ সন্ত্রাসী কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। জেল থেকে বের হওয়ার পরপরই তারা পুনরায় বিভিন্ন এলাকার টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও অবৈধ ব্যবসার দখল নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে, যার ফলে মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয়েছে রক্তাক্ত সংঘাত। মোহাম্মদপুর, মিরপুর, পল্লবী, ভাষানটেক, কেরানীগঞ্জ ও যাত্রাবাড়ীর মতো জনবহুল এলাকা এখন যেন সাধারণ মানুষের জন্য মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে।সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত সারা দেশে চাঁদাবাজির ঘটনায় প্রায় সাতশ মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং আট শতাধিক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কেবল ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকাতেই গত চার মাসে আড়াইশোর কাছাকাছি মামলা হয়েছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের একাংশ যখন আধিপত্য বিস্তারের স্বার্থে চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়ে, তখন সমাজজুড়ে সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই প্রবণতা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, বরং তা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজধানী ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে অবৈধ মাদক ব্যবসা ও বাজার দখলের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত একাধিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী প্রতিনিয়ত অস্ত্রের মহড়া দিচ্ছে, যা জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পণ্যবাহী ট্রাক বা পিকআপ ভ্যানগুলো রাজধানীতে প্রবেশের সময় একাধিক স্তরে চাঁদা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। মোহাম্মদপুর ও শ্যামলী এলাকায় এখন দিন-দুপুরে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে, অথচ অপরাধীদের ভয়ে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এলাকাটিতে বিশেষ অভিযান চালালেও অপরাধীদের দৌরাত্ম্য পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না। গত মঙ্গলবার আদাবরে পুলিশের ওপর ছিনতাইকারীদের হামলার ঘটনা প্রমাণ করে যে, অপরাধীরা কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, ৫ আগস্টের পর যারা কারাগার থেকে ছাড়া পেয়েছে, তাদের অনেকেই নতুন রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে। মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় অন্তত সতেরোটি বড় অপরাধী চক্র সক্রিয় রয়েছে, যারা মাদক কারবার ও ছিনতাইয়ের মতো কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখছে।এই চরম অরাজকতা ও আতঙ্কের বিরুদ্ধে সম্প্রতি স্থানীয় বাসিন্দারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিক্ষোভ করেছেন। মোহাম্মদপুর কমিউনিটি অ্যালায়েন্সের ব্যানারে আয়োজিত মানববন্ধনে তারা এলাকায় পুলিশ ও টহল জোরদার করার পাশাপাশি সিসিটিভি নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে চাঁদাবাজদের ধরতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে আইনি প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় জামিন পেয়ে অপরাধীরা পুনরায় একই কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে। সরকারি কৌঁসুলিরা মনে করেন, মামলার বাদী ও সাক্ষীদের অনুপস্থিতি এবং হুমকির মুখে সাক্ষ্য দিতে ভয়ের কারণেও অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা ছাড়া এই অপরাধচক্র ভাঙা সাধারণ মানুষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল