প্রিন্ট এর তারিখ : ১৯ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬
সাইবার হামলা ঠেকাতে কৃত্রিম শহর বানাল এফবিআই
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
সাইবার অপরাধের ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলায় এবং বাস্তবভিত্তিক তদন্ত কৌশলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দক্ষ করে তুলতে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই অ্যালাবামা অঙ্গরাজ্যের হান্টসভিলে গড়ে তুলেছে এক বিশাল কৃত্রিম শহর। প্রায় বাইশ হাজার বর্গফুটের এই অভিনব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি মূলত এমন একটি সুরক্ষিত পরিবেশ, যেখানে তদন্তকারীরা সাইবার হামলার ভয়াবহতা এবং তা প্রতিরোধের কৌশল হাতে-কলমে শিখতে পারছেন। প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যমগুলোতে সম্প্রতি এই গোপন শহরের ভেতরের চিত্র উন্মোচিত হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে বেশ আলোচনা তৈরি হয়েছে। ক্লাসরুমের তাত্ত্বিক আলোচনার বাইরে গিয়ে তদন্তকারীদের বাস্তব পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করানোর লক্ষ্যেই এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।বর্তমানে সাইবার অপরাধের পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এফবিআইয়ের সর্বশেষ তথ্যমতে, শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রে সাইবার অপরাধের কারণে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দুই হাজার ৯০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ছাব্বিশ শতাংশ বেশি। এই বিশাল ক্ষতির একটি বড় অংশের পেছনে রয়েছে র্যানসমওয়্যার বা মুক্তিপণ দাবির মতো ক্ষতিকারক সফটওয়্যারের ব্যবহার, যা দেশটির বিদ্যুৎ কেন্দ্র, হাসপাতাল এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই হুমকি মোকাবিলায় কাইনেটিক সাইবার রেঞ্জ নামের এই শহরটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকরী মডেল হিসেবে তৈরি করা হয়েছে।২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে যাত্রা শুরু করা এই কৃত্রিম শহরটিতে একটি আধুনিক নগরের প্রায় প্রতিটি অনুষঙ্গ বিদ্যমান। এখানে আসবাবপত্রে সুসজ্জিত বাড়িঘর, হোটেল, গ্যাস স্টেশন, সুপার শপ, আদালত, হাসপাতাল এবং একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানি পর্যন্ত রয়েছে। এসবের সঙ্গে আছে বাস্তবসম্মত রাস্তাঘাট ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। উদ্বোধনের পর থেকে এ পর্যন্ত এফবিআইয়ের নিজস্ব কর্মীসহ বিভিন্ন ফেডারেল ও স্থানীয় সংস্থার প্রায় চৌদ্দশ শিক্ষার্থীকে এখানে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। শহরের প্রতিটি স্থাপনা এমন সব আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিভাইসের নেটওয়ার্কে যুক্ত, যা হুবহু বাস্তবের মতোই কার্যকর। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে এই পুরো সিস্টেমটি এমনভাবে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে, যাতে প্রশিক্ষণের সময় চালানো কৃত্রিম কোনো সাইবার হামলা বা ম্যালওয়্যার কোনোভাবেই মূল নেটওয়ার্কের বাইরে ছড়িয়ে পড়তে না পারে।এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ডেটা সেন্টারটিতে দুইশটিরও বেশি ফিজিক্যাল সার্ভার স্থাপন করা হয়েছে, যা উইন্ডোজ ও লিনাক্সসহ বিভিন্ন অপারেটিং সিস্টেমে পরিচালিত হয়। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডেভ বিচবোর্ড জানিয়েছেন যে, তদন্তকারীরা যখন বাস্তবে কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠানে সাইবার হামলার তদন্তে যান, তখন যে ধরনের মানসিক ও শারীরিক চাপের সম্মুখীন হন, সেটিই এখানে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ পরিবেশটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে কিছুটা অস্বস্তিকর, অন্ধকার ও কোলাহলপূর্ণ রাখা হয়েছে, যাতে তদন্তকারীরা বাস্তব জীবনের চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দ্রুত এবং নির্ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।এই কৃত্রিম শহরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ডিজিটাল ফরেনসিকের আধুনিক প্রশিক্ষণ। সাইবার অপরাধীরা এখন যে ধরনের এনক্রিপশন বা সুরক্ষিত প্রযুক্তি ব্যবহার করে, তার নিরাপত্তা প্রাচীর ভেদ করে তথ্য সংগ্রহের কৌশল এখানে শেখানো হয়। যদিও এই প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত টুলগুলো নিয়ে প্রযুক্তি মহলে বিতর্ক রয়েছে, কারণ এগুলো অনেক ক্ষেত্রে স্মার্টফোন নির্মাতা কোম্পানিগুলোর সিস্টেমের অজানা দুর্বলতাকে কাজে লাগায়। তবে সাইবার সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য রুখতে এই ধরনের আধুনিক ফরেনসিক প্রশিক্ষণকে এখন সময়ের দাবি হিসেবে দেখছে এফবিআই। সব মিলিয়ে, ডিজিটাল যুগের অপরাধ দমনে হান্টসভিলের এই শহরটি হয়ে উঠেছে আধুনিক গোয়েন্দা প্রশিক্ষণের এক অনন্য কেন্দ্র।সূত্র: টেকক্রাঞ্চ।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল