প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬
উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম নিয়ে মুখোমুখি ওয়াশিংটন ও তেহরান
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
পারমাণবিক বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও কারিগরি সক্ষমতা থাকলে ইরানের কাছে মজুদ থাকা উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মাত্র কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী বিশুদ্ধতায় রূপান্তর করা সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান শান্তি আলোচনার টেবিলে এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ এখন সবচেয়ে জটিল ও স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির মানের অত্যন্ত কাছাকাছি থাকা প্রায় এক হাজার পাউন্ড ইউরেনিয়ামের মজুদ নিয়ে দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই মজুদকে ‘পারমাণবিক ধূলিকণা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তা হস্তান্তরের জন্য বারবার চাপ দিচ্ছেন, অন্যদিকে ইরান দাবি করে আসছে যে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক প্রয়োজনে পরিচালিত হচ্ছে।ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের হিসাব বেশ উদ্বেগজনক। বিশেষজ্ঞদের ধারণা অনুযায়ী, বর্তমানে ইরানের কাছে যে পরিমাণ ইউরেনিয়াম মজুদ রয়েছে, তা দিয়ে প্রায় দশটি পারমাণবিক বোমা তৈরি করা সম্ভব। যদিও সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, কিন্তু ইউরেনিয়ামের মজুদের বিষয়টি এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। পারমাণবিক বিস্তাররোধ বিশেষজ্ঞ এরিক ব্রুয়্যারের মতে, এই উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণের সুনির্দিষ্ট শর্ত ছাড়া কোনো স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সমীচীন হবে না। তিনি মনে করেন, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বিভাজ্য উপাদান বা ফিসাইল ম্যাটেরিয়ালের ঘনত্ব বাড়ানোই ইরানের মূল লক্ষ্য, যা নাতাঞ্জ, ফোরদো ও ইসফাহানের ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোতে নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে নেওয়া হয়েছে।ইরান সাধারণত গ্যাসীয় প্রক্রিয়ায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে থাকে এবং সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশটির স্থাপনাগুলোতে প্রায় আধা টন ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ও চার শতাধিক পাউন্ড ২০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ রয়েছে। যদিও গত বছর মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ বিমান হামলার পর ইরান আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দিয়েছে, তবুও গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভাষ্যমতে এই মজুদ ধ্বংস হয়নি বরং ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। ট্রাম্প প্রশাসন বারবার শক্তি প্রয়োগের হুমকি দিলেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, এই ধরনের সামরিক অভিযান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তেজস্ক্রিয় উপাদানটি কোথায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বা তা আদৌ ধ্বংস হয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য না থাকায় সামরিক হামলার চেয়ে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় এটি নিষ্ক্রিয় করার ওপরই জোর দেওয়া হচ্ছে।এই সংকট নিরসনে দুটি প্রধান পদ্ধতির কথা ভাবা হচ্ছে। প্রথমত, মার্কিন সহায়তায় ভ্রাম্যমাণ কোনো সুবিধা ব্যবহার করে ইউরেনিয়াম গ্যাসকে স্থিতিশীল পাউডার আকারে রূপান্তর করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া। দ্বিতীয় বিকল্পটি হলো ‘ডাউনব্লেন্ডিং’ প্রক্রিয়া, যেখানে উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের সাথে কম বিশুদ্ধতার ইউরেনিয়াম মিশিয়ে এর ঘনত্ব কমিয়ে ফেলা হয়। তবে পদ্ধতি যাই হোক না কেন, চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করছে ইরান কতটা স্বচ্ছতার সাথে এই প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করে তার ওপর। ব্রুয়্যারের মতে, ইরান যদি দাবি করে যে কোনো অংশ হামলার সময় ধ্বংস হয়ে গেছে, তবে তা যাচাই করা হবে প্রায় অসম্ভব এক চ্যালেঞ্জ। সব মিলিয়ে, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান অপসারণের এই দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়াই এখন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও বিশ্ব রাজনীতির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষার নামান্তর হয়ে দাঁড়িয়েছে।সূত্র: সিএনএন।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল