প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৪ জুন ২০২৬
দীর্ঘ বৈরিতার অবসানে সমঝোতার পথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান
ইয়াসরির মাহবুব, স্টাফ রিপোর্টার ||
দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্ক ও চরম সামরিক উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে একটি প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) খসড়া তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এই খসড়ায় ওমানের মধ্যস্থতায় তেল নিষেধাজ্ঞা শিথিল, বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করা, ইরানের জব্দকৃত বিশাল অর্থনৈতিক সম্পদ অবমুক্ত করা এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক এই ঐতিহাসিক খসড়া সমঝোতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।ইরানি ওই শীর্ষ কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, ওয়াশিংটন ও তেহরান যদি এই প্রাথমিক খসড়া সমঝোতায় চূড়ান্তভাবে সম্মত হয়, তবে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা সম্পন্ন হবে।খসড়ার অন্যতম প্রধান শর্ত অনুযায়ী, ইরান অবিলম্বে সব ধরনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচলের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ খুলে দেবে। এর বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্রও ইরানি বন্দরগুলোর ওপর এতদিন ধরে আরোপিত নৌ অবরোধ ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা শুরু করবে। সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে এই নৌ অবরোধ পুরোপুরি কার্যকরভাবে তুলে নেওয়া হবে।অর্থনৈতিক ও নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত বিষয়ে খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, যতক্ষণ না পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো চুক্তি সম্পন্ন হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে কোনো ধরনের অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারবে না। এছাড়া চূড়ান্ত সমঝোতা সম্পন্ন হওয়ার পর একটি সুনির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী, বিগত বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক ইরানের ওপর আরোপিত সব ধরনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে।খসড়া সমঝোতার মূল অর্থনৈতিক দিকসমূহ:নিষেধাজ্ঞায় স্থিতি: চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার আগ পর্যন্ত ইরানের ওপর নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা দেবে না মার্কিন প্রশাসন।ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: চূড়ান্ত সমঝোতার পর একটি নির্দিষ্ট রোডম্যাপ অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা স্থায়ীভাবে তুলে নেওয়া হবে।তেল বিক্রির সুযোগ: অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ইরানের ওপর থাকা তেল রফতানির নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা ছাড় দেওয়া হবে, যাতে তেহরান আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রি করে তাদের থমকে যাওয়া রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারে।জব্দকৃত সম্পদ ফেরত: আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের প্রায় ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের জব্দকৃত তহবিল ফেরত দেওয়ার বিষয়টি খসড়ায় স্থান পেয়েছে। এই অর্থ সরাসরি নগদ স্থানান্তর, আঞ্চলিক সহযোগিতা তহবিল গঠন কিংবা ক্রেডিট লাইনের মাধ্যমে ইরানকে ফেরত দেওয়া হতে পারে।আঞ্চলিক উন্নয়ন পরিকল্পনা: চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার ৬০ দিনের আলোচনার মধ্যে ইরানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা যৌথ উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে। ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তার স্বার্থে এই খসড়ায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কঠোর নজরদারির মধ্যে রাখার শর্ত দেওয়া হয়েছে। খসড়ার শর্ত অনুযায়ী, ইরান কোনো অবস্থাতেই সামরিক ব্যবহারের জন্য পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি কিংবা তা অর্জন করতে পারবে না। চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার আগ পর্যন্ত দেশটির বিদ্যমান পারমাণবিক সক্ষমতা বর্তমান স্তরেই অপরিবর্তিত রাখতে হবে এবং নতুন করে কোনো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা পারমাণবিক স্থাপনা সম্প্রসারণ করা যাবে না। তবে ভবিষ্যৎ চুক্তির অংশ হিসেবে গবেষণার জন্য উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ রাখার বিষয়ে কিছুটা শিথিলতা বা অনুমতি দেওয়া হতে পারে। সামগ্রিকভাবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ইউরেনিয়াম ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট সব কারিগরি বিষয় এই ৬০ দিনের বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে।সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও মার্কিন মিত্র ইসরায়েলের মধ্যে চলমান ছায়াযুদ্ধ এবং লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জেরে বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই খসড়া সমঝোতা যদি শেষ পর্যন্ত একটি বাস্তব ও সফল চুক্তিতে রূপ নিতে পারে, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যের চিরবৈরী দুই পরাশক্তির দীর্ঘদিনের উত্তেজনা প্রশমনে এক অভাবনীয় টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করবে, যা একই সাথে বিশ্ব অর্থনীতি ও তেলের বাজারকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা দেবে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল