প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৩ জুন ২০২৬
তিন দশক পর কবর থেকে উঠছে সালমান শাহের দেহাবশেষ
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
ঢাকাই সিনেমার ইতিহাসে অকালপ্রয়াণে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করা অমর নায়ক সালমান শাহের মৃত্যুর তিন দশক পেরিয়ে গেলেও এখনো কাটেনি রহস্যের ধোঁয়াশা। নব্বইয়ের দশকের এই উজ্জ্বলতম নক্ষত্রের বিদায় আজও কোটি ভক্তের হৃদয়ে গভীর ক্ষত হয়ে আছে। মাত্র চার বছরের অভিনয় জীবনে ২৭টি সিনেমার মাধ্যমে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছানো এই নায়কের মৃত্যু মামলা এবার নতুন মোড় নিয়েছে। আদালতের নির্দেশে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে কবর থেকে তাঁর দেহাবশেষ উত্তোলনের বিষয়টি। সিআইডির আবেদনের প্রেক্ষিতে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যা তদন্তে নতুন কোনো তথ্য উন্মোচন করবে কি না, তা নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা।১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে ইস্কাটনের নিজ বাসভবনে মারা যান সালমান শাহ। সেই সময় থেকে শুরু করে সিআইডি, বিচার বিভাগীয় তদন্ত, র্যাব এবং পিবিআই—সব সংস্থাই একে ‘আত্মহত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করলেও তাঁর পরিবার তা মেনে নেয়নি। সালমান শাহের মা নীলা চৌধুরী শুরু থেকেই এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। তাঁর মতে, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট থেকে শুরু করে পুরো তদন্ত প্রক্রিয়াতেই বড় ধরনের ত্রুটি ছিল। সময়ের পরিক্রমায় মামলাটি গত বছর রমনা থানায় হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়, যেখানে সালমান শাহের স্ত্রী সামীরা হকসহ মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে।দীর্ঘ ৩০ বছর পর কবর থেকে দেহাবশেষ উত্তোলনের এই আইনি পদক্ষেপ নিয়ে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে হাড় থেকে খুনের সুনির্দিষ্ট আলামত পাওয়া অত্যন্ত জটিল। তবে তিনি উল্লেখ করেন, যদি বিষক্রিয়া বা ভারী কোনো ধাতুর প্রভাবে মৃত্যু ঘটে থাকে, তবে ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে তার অস্তিত্ব নির্ণয় করা সম্ভব হতে পারে।অন্যদিকে, বাদীপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহমেদের ভাষ্যমতে, ঘটনার সময় চেতনানাশক ওষুধের ব্যবহারের যে অভিযোগ তোলা হয়েছিল, তার সত্যতা যাচাইয়ের জন্যই হয়তো তদন্তকারী সংস্থা এই উদ্যোগ নিয়েছে। তবে তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন যে, দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর ড্রাগের মাত্রা শনাক্ত করা প্রযুক্তিগতভাবে বেশ চ্যালেঞ্জিং।সালমান শাহের মা নীলা চৌধুরী অবশ্য এই প্রক্রিয়াকে কিছুটা সন্দেহের চোখেই দেখছেন। তিনি মনে করেন, দেহাবশেষ উত্তোলনের মতো জটিল প্রক্রিয়ার চেয়ে বরং মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং তাদের নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের ওপর গুরুত্ব দেওয়া বেশি প্রয়োজন। তাঁর মতে, ঘটনার সময় যাঁরা উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের জবানবন্দি থেকেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসতে পারে। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মতেও, কেবলমাত্র বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ওপর নির্ভর না করে পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং ঘটনার সময়ের প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার ওপর জোর দিলে তদন্তে গতি আসতে পারে। কারণ, দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পর মৃতদেহ থেকে শ্বাসরোধের মতো কোনো আঘাতের চিহ্ন শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব।আগামী ২৩ জুন এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ ধার্য রয়েছে। সালমান শাহের মৃত্যুর রহস্য চিরকাল মাটির নিচেই চাপা থাকবে, নাকি আদালতের এই নতুন পদক্ষেপের মাধ্যমে সত্য উন্মোচিত হবে—সেই প্রতীক্ষায় আছে দেশবাসী। ভক্তদের প্রত্যাশা, দীর্ঘ তিন দশকের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এবার অন্তত প্রিয় নায়কের মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল