প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১১ জুন ২০২৬
হরমুজ প্রণালি বন্ধে ইরানের সিদ্ধান্ত, নতুন সংকটে বিশ্ববাণিজ্য
শামিমা লিয়া, আন্তর্জাতিক ডেস্ক এডিটর ||
বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে আবারও চরম উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে এখন যুদ্ধের কালো মেঘ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক এক আকস্মিক ও তীব্র সামরিক হামলার পরপরই পালটা ব্যবস্থা হিসেবে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করেছে ইরানের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড। ইরানের রাজধানী তেহরান থেকে পাওয়া খবরের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার সংবাদদাতা মোহাম্মদ ভল এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ইরানের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এই মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ দিয়ে যাতায়াতের চেষ্টা করা যেকোনো ধরনের নৌযানকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হবে। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বিশ্ব বাণিজ্যে এক বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূত্রপাত হয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক হুঁশিয়ারির মধ্য দিয়ে। ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর ঠিক আগমুহূর্তে ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জানান, আগের দিন তারা ইরানের ওপর অত্যন্ত শক্তিশালী আঘাত হেনেছেন এবং সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে পরদিনও একইভাবে বিধ্বংসী আক্রমণ চালানো হবে। নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ইরানের নেতারা একটি যৌক্তিক সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য অনেক বেশি অতিরিক্ত সময় নষ্ট করছেন এবং মার্কিন স্বার্থের ক্ষতি করছেন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন আক্রমণাত্মক অবস্থানকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার জন্য চরম ক্ষতিকর এবং উসকানিমূলক বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।মার্কিন এই আগ্রাসনের মুখে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কঠোর অবস্থান নিয়েছেন ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেছেন, যেকোনো ধরনের বিদেশি চাপ, নিষেধাজ্ঞা কিংবা সামরিক হুমকির বিরুদ্ধে ইরান নিজের পুরো শক্তি নিয়ে মাঠে থাকবে এবং বিন্দুমাত্র পিছু হটবে না। কিন্তু ইরানের এই অনমনীয় মনোভাবের জবাবে ওয়াশিংটনের সুর আরও কঠোর হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এক বিবৃতিতে জানান, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল স্থাপনাগুলোতে মার্কিন বিমান বাহিনী বোমা হামলা অব্যাহত রাখবে। তার দাবি অনুযায়ী, ইরানকে একটি শান্তিপূর্ণ সমঝোতায় আসার জন্য যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তেহরান সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।ট্রাম্পের এই চূড়ান্ত সবুজ সংকেত দেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের মূল ভূখণ্ডে গর্জে ওঠে মার্কিন যুদ্ধাস্ত্র। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকমের সরাসরি নির্দেশনায় ইরানের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে একযোগে হামলা চালানো হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক জরুরি হালনাগাদ বার্তায় সেন্টকমের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের বিশেষ বাহিনী পুরো ইরানজুড়ে দেশটির সামরিক নজরদারি সক্ষমতা, যোগাযোগ অবকাঠামো এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নিখুঁত ও সুনির্দিষ্ট হামলা পরিচালনা করেছে। মার্কিন সামরিক কমান্ডের দাবি, ইরানের এমন কিছু নির্দিষ্ট সামরিক স্থাপনা ও অস্ত্রাগারকে লক্ষ্য করে অত্যাধুনিক গোলাবারুদ নিক্ষেপ করা হয়েছে, যা লোহিত সাগর ও সংলগ্ন অঞ্চলের আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ এবং সেখানে মোতায়েন থাকা মার্কিন বাহিনীর নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেন্টকম স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছে, ইরানের ‘অযাচিত ও অব্যাহত আগ্রাসনের’ জবাবেই ওয়াশিংটন এই কড়া পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় মার্কিন বাহিনী সম্পূর্ণ সতর্ক ও প্রস্তুত রয়েছে।বাস্তবতা হলো, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই বৈরিতা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। গত এপ্রিল মাসে দুই দেশ একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল, যার প্রাথমিক মেয়াদ ছিল মাত্র দুই সপ্তাহ। কিন্তু সেই চুক্তির পরেও পর্দার আড়ালে দুই পক্ষের মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে হামলা ও পালটা হামলা চলতেই থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বিরোধ মেটাতে নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করার বেশ কিছু আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। আর এই আলোচনার টেবিল ভেঙে যাওয়ার পরপরই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সংঘাত এখন এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।সূত্র: আল-জাজিরা।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল