প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১০ জুন ২০২৬
ইলিশ উৎপাদনে জেলেদের জন্য বাড়তি আর্থিক সহায়তার ঘোষণা সরকারের
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
দেশের জাতীয় সম্পদ রুপালি ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং এর পোনা বা জাটকা রক্ষায় সরকার এক যুগান্তকারী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ এই বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করে জানিয়েছেন যে, মা মাছ ও জাটকা রক্ষার স্বার্থে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে যখন নদীতে মাছ ধরার ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি থাকে, তখন দেশের প্রান্তিক জেলে পরিবারগুলো যাতে চরম অর্থনৈতিক সংকটে না পড়ে, সেজন্য তাদের আর্থিক সহায়তার পরিমাণ আরও বৃদ্ধি করার জন্য সরকার আন্তরিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।গত মঙ্গলবার, নয়ই জুন জাতীয় সংসদের অধিবেশনে লক্ষ্মীপুর এক আসনের সরকারি দলের সংসদ সদস্য এম শাহাদাত হোসেন কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ বিধিতে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটি নোটিশ উত্থাপন করেন। স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন মূলত ‘জাটকা সংরক্ষণ ও ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশের নদনদীগুলোতে নজরদারি বাড়ানো এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান জোরদার করার’ বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরেন। সেই মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের আনুষ্ঠানিক জবাব দিতে গিয়েই মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী সরকারের নানামুখী কল্যাণমূলক পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা সংসদকে অবহিত করেন। তিনি বলেন, দেশের দরিদ্র ও প্রকৃত মৎস্যজীবীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং তাদের বিকল্প আয়ের উৎস তৈরির লক্ষ্যে মন্ত্রণালয় বেশ কিছু নতুন প্রকল্প গ্রহণের কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে, যেন মাছ ধরার ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন তারা কেবল নদী বা সাগরের ওপর নির্ভরশীল না থেকে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন।সংসদীয় অধিবেশনে মন্ত্রী অত্যন্ত সহানুভূতির সাথে উল্লেখ করেন যে, সরকারের প্রধান এবং মূল লক্ষ্যই হলো যেকোনো মূল্যে জাটকা নিধন পুরোপুরি বন্ধ করা। তবে আমাদের দেশের মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ অত্যন্ত দরিদ্র। অনেক সময় তীব্র অভাবের তাড়নায় এবং পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার নিরুপায় প্রয়াসে তারা সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে নেমে জাটকা ধরতে বাধ্য হন। এই মানবিক ও সামাজিক সংকটটি দূর করাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।দরিদ্র জেলেদের অর্থনৈতিক পরাধীনতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে তিনি গ্রামীণ জনপদে প্রচলিত ‘দাদন’ প্রথার কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, অধিকাংশ সাধারণ জেলের নিজস্ব কোনো জাল, নৌকা বা আধুনিক মাছ ধরার সরঞ্জাম থাকে না। এই সুযোগে স্থানীয় প্রভাবশালী মহাজন বা বড় মাছ ব্যবসায়ীরা জেলেদের অগ্রিম টাকা বা সরঞ্জাম ধার দেন, যা গ্রামীণ সমাজে দাদন নামে পরিচিত। এই অলিখিত ও অনানুষ্ঠানিক ঋণের জালে জড়িয়ে জেলেরা একপ্রকার দাসত্বে বাধ্য হন। কারণ দাদন নেওয়ার পর তারা নদী থেকে যে মাছই ধরুন না কেন, তা বাজারের প্রচলিত মূল্যে বিক্রি করতে পারেন না। তারা বাধ্য হন সেই নির্দিষ্ট মহাজনের কাছে অত্যন্ত কম এবং নির্ধারিত মূল্যে সব মাছ তুলে দিতে। ফলে দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খাটলেও জেলেদের ভাগ্য বদলায় না, তারা আজীবন দরিদ্রই থেকে যান এবং ঋণের চক্র থেকে বের হতে পারেন না।জেলেদের এই নির্মম ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য সরকার এখন কেবল চাল বা ত্রাণ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, তাদের গবাদিপশু পালনসহ বিভিন্ন ধরনের আয়বর্ধক এবং উৎপাদনশীল প্রকল্পের সাথে যুক্ত করার উদ্যোগ নিচ্ছে। এর ফলে জেলেরা বিকল্প উপায়ে ঘরে বসেই আয় করতে পারবেন। বিশেষ করে প্রতি বছরের পয়লা নভেম্বর থেকে ত্রিশে জুন পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে যখন জাটকা ও ইলিশ সুরক্ষায় নদীতে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকে, তখন যেন তাদের আর এই লোভী দাদন ব্যবসায়ী বা মহাজনদের দুয়ারে হাত পাততে না হয়। উল্লেখ্য, এই নির্দিষ্ট সময়ে দেশের কোথাও পঁচিশ সেন্টিমিটারের চেয়ে ছোট আকারের ইলিশ বা জাটকা ধরা, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবহন করা, বাজারে বিক্রি করা, সাধারণ মানুষের কেনাকাটা কিংবা গুদামে মজুত করে রাখা দেশের প্রচলিত আইনে সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।রুপালি ইলিশের এই প্রজনন ও বেড়ে ওঠার সময়টিকে নিরাপদ করতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় অত্যন্ত কঠোর ভূমিকা পালন করছে। জাটকা সুরক্ষায় দেশের প্রধান ইলিশ উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত চাঁদপুর, বরিশালসহ উপকূলীয় জেলাগুলো এবং বিশেষ করে দেশের প্রধান দুই নদী পদ্মা ও মেঘনার অববাহিকায় নিয়মিত দিনরাত যৌথ অভিযান চালানো হচ্ছে। আইন অমান্য করে যারা দেশের এই জাতীয় সম্পদ ধ্বংস করার চেষ্টা করছে, তাদের তাৎক্ষণিক শাস্তির আওতায় আনতে জেলা প্রশাসনের সহায়তায় সার্বক্ষণিক ভ্রাম্যমাণ আদালত বা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। সরকারের এই সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ইলিশের উৎপাদন অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল