প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১০ জুন ২০২৬
এআই আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই আজ আমাদের জীবনযাত্রার প্রতিটি স্তরে এক অলক্ষ্য চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। কৃষিকাজে আবহাওয়া ও ফসলের পূর্বাভাস দেওয়া থেকে শুরু করে শিক্ষাব্যবস্থায় জটিল বিষয় সহজ করা কিংবা নিখুঁত ভাষার ব্যবহারে মানুষের সহকারী হওয়া—প্রযুক্তির এই উৎকর্ষ নিঃসন্দেহে এক জাদুকরী বিপ্লব। তবে পর্দার এই চোখধাঁধানো আলোর পেছনেই ঘনীভূত হচ্ছে এক গভীর ও অন্ধকার মেঘ, যার নেতিবাচক প্রভাব সমাজকে এক বড় সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।যে যন্ত্র নিজে থেকে ছবি আঁকতে পারে, মানুষের মতো করে সাহিত্য রচনা করতে পারে কিংবা অবিকল মানুষের কণ্ঠে কথা বলতে পারে, তার এই অভাবনীয় ক্ষমতা দেখে আমরা যেমন চমৎকৃত হচ্ছি, তেমনই এর অপব্যবহারের ভয়াবহ দিকটি আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে। প্রযুক্তি যখন অসৎ মানুষের হাতের অস্ত্র হয়ে ওঠে, তখন তার পরিণতি কতটা মারাত্মক হতে পারে, তা আজ আর কোনো কাল্পনিক রূপকথা নয়। আমরা যদি একটু চোখ কান খোলা রাখি, তবে দেখতে পাব বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো এক সাধারণ শিক্ষার্থীর চরম মানসিক যন্ত্রণার চিত্র, যার সামাজিক সম্মান ও মর্যাদা রাতারাতি ধূলিসাৎ হয়ে গেছে কৃত্রিমভাবে তৈরি কোনো কুৎসিত ‘ডিপফেক’ ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ার কারণে। আবার অন্যদিকে গ্রামীণ জনপদের কোনো এক সাধারণ পরিশ্রমী বাবা তার সন্তানের হুবহু কণ্ঠস্বর শুনে প্রতারিত হচ্ছেন। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে সন্তানের আকুল কান্নায় আইফোন বা এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি করা সেই নকল কণ্ঠের ফাঁদে পা দিয়ে তিনি নিজের জীবনের শেষ সঞ্চয়টুকু তুলে দিচ্ছেন অপরাধীদের হাতে। এই ঘটনাগুলো আমাদের চারপাশের এক নির্মম ও রূঢ় বাস্তবতার প্রতিফলন। প্রতিটি ডিজিটাল তথ্য এবং প্রতিটি গাণিতিক নিয়মের পেছনে লুকিয়ে আছে এক একটি রক্ত-মাংসের মানুষের জীবন ও আবেগ, অথচ বর্তমান আইনি ব্যবস্থা এই সাধারণ মানুষদের নিরাপত্তা দিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে।এই চরম সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েই আজ আমাদের দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংক্রান্ত একটি সুনির্দিষ্ট ও কঠোর আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। আইনশাস্ত্রের দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, আমাদের বিদ্যমান আইনি পরিকাঠামো এই আধুনিক প্রযুক্তির দ্রুতগতির পরিবর্তনের সঙ্গে কোনোভাবেই মানিয়ে নিতে পারছে না। আমাদের দেশে প্রচলিত ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন’-এর মতো কিছু আইনি হাতিয়ার থাকলেও, সেগুলো মূলত কোনো অপরাধ ঘটে যাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার মতো প্রতিক্রিয়াশীল মাধ্যম। তা ছাড়া এই আইনগুলোর মূল ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ইন্টারনেটের প্রাথমিক যুগে, যার ফলে আধুনিক জেনারেটিভ এআই, স্বয়ংক্রিয় বৈষম্যমূলক আচরণ কিংবা মানুষের ব্যক্তিগত শারীরিক ও জৈবিক তথ্যের অবৈধ ব্যবহারের মতো জটিল বিষয়গুলো মোকাবিলা করার মতো সূক্ষ্ম ও দূরদর্শী ভাষার অভাব রয়েছে সেখানে।যখন কোনো অপরাধী অন্য কারও কণ্ঠ নকল করে ডিজিটাল মাধ্যমে আর্থিক জালিয়াতি করে, তখন আমাদের দেশের প্রচলিত দণ্ডবিধি এক চরম সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে। আইনগতভাবে জালিয়াতি, মানহানি কিংবা ছদ্মবেশ ধারণের যে সনাতন সংজ্ঞা রয়েছে, তা দিয়ে এই নতুন যুগের অপরাধকে ধরা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ এখানে অপরাধের হাতিয়ার কোনো দৃশ্যমান দলিল বা সশরীরে উপস্থিত কোনো মানুষ নয়, বরং এটি একটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হওয়া ডিজিটাল সত্তা। এর পাশাপাশি আমাদের প্রচলিত সাক্ষ্য আইনও এখন এক অভূতপূর্ব সত্যতা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিচারালয়ে যেকোনো ডিজিটাল প্রমাণের সত্যতা নিশ্চিত করা এখন এক দূরহ কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে এখন এত নিখুঁতভাবে অডিও এবং ভিডিও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে যে, আধুনিক পরীক্ষাগারের বিশেষজ্ঞরা পর্যন্ত সেটির সত্যতা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছেন। আমরা যদি এই প্রযুক্তি দ্বারা উৎপাদিত কন্টেন্টগুলোর গ্রহণযোগ্যতা এবং অপরাধ শনাক্তকরণের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো আইনি দিকনির্দেশনা তৈরি করতে না পারি, তবে দেশের সামগ্রিক বিচারব্যবস্থা এবং বিচারকদের ওপর একটি অসম্ভব মানসিক ও পদ্ধতিগত বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হবে।এমনকি আমাদের দেশের অপরাধ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার পদ্ধতিগত ক্ষেত্রগুলোতেও জরুরি সংস্কার প্রয়োজন। আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কীভাবে মহাকাশে ভাসমান ক্লাউডভিত্তিক জটিল ডেটা বা তথ্য তল্লাশির জন্য আইনি পরোয়ানা জারি করবে, তা এখনও অস্পষ্ট। আবার দেশের বাইরে অবস্থিত কোনো সার্ভার বা প্রযুক্তি ব্যবহার করে যখন বাংলাদেশের কোনো নাগরিকের সম্মানহানি বা আর্থিক ক্ষতি করা হয়, তখন সেই অপরাধের বিচার কোন দেশের আইনে বা কার এখতিয়ারে হবে, তা এক বড় প্রশ্ন। এগুলো কেবল আইন বিষয়ের শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমের তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং বর্তমান বিচারব্যবস্থার এক বাস্তব সংকট। এই প্রযুক্তির শিকারে পরিণত হওয়া মানুষদের মানসিক ট্রমা বা কষ্টের কথা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। কোনো অদৃশ্য এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যখন একজন মানুষ নিজেকে পুরোপুরি অসহায় আবিষ্কার করে, তখন তার যে পরিচয় চুরি বা ব্যক্তিত্বের বিকৃতির শিকার হতে হয়, সেই মানসিক ক্ষত কোনো প্রচলিত আইনি ক্ষতিপূরণ বা অর্থ দিয়ে নিরাময় করা সম্ভব নয়।সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, আমাদের দেশের পবিত্র সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদে প্রতিটি নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার যে মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, তা আজ বড় হুমকির মুখে। এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে যেখানে আমাদের ব্যক্তিগত তথ্যই হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মূল জ্বালানি, সেখানে এই সাংবিধানিক অধিকার প্রতিনিয়ত লঙ্ঘিত হচ্ছে। মানুষের চেহারা চেনার প্রযুক্তি কিংবা স্বয়ংক্রিয় চালিত অ্যালগরিদমগুলো যখন কোনো জবাবদিহিতা বা সরকারি তদারকি ছাড়া অবাধে কাজ করে, তখন নাগরিকের গোপনীয়তা বজায় রাখা একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়ে।তাই নাগরিকদের সুরক্ষার স্বার্থে আমাদের একটি স্বাধীন, শক্তিশালী এবং সমন্বিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আইন তৈরি করা আবশ্যক। এই প্রস্তাবিত আইনের মূল ভিত্তি হতে হবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং মৌলিক মানবাধিকারের সুরক্ষা। এআই দ্বারা তৈরি যেকোনো ধরনের ছবি, অডিও বা ভিডিওতে স্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক জলছাপ বা নির্দেশক থাকতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ সহজেই বুঝতে পারে কোনটি আসল আর কোনটি কৃত্রিম। যে সমস্ত প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই ধরনের ক্ষতিকর ও বৈষম্যমূলক কনটেন্ট ছড়াতে সাহায্য করবে, তাদেরও আইনের আওতায় এনে শাস্তির বিধান করতে হবে। তবে এই আইনটি এককভাবে সফল হতে পারবে না, যদি না এর পেছনে একটি শক্তিশালী ‘ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা কাঠামো’ তৈরি করা যায়। এমন একটি আইনি কাঠামো তৈরি করা এখন আর কেবল সময়ের দাবি নয়, বরং এটি একটি জাতীয় জরুরি প্রয়োজনীয়তা।তবে এই ধরনের কঠোর আইনের কথা শুনলেই স্বাভাবিকভাবে একটি বিতর্কের সৃষ্টি হয় যে, এটি কি আমাদের দেশের প্রযুক্তিনির্ভর তরুণ সমাজ ও উদ্ভাবকদের কাজের স্বাধীনতা কেড়ে নেবে? এটি কি নতুন গড়ে ওঠা প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসা বা স্টার্টআপগুলোকে বিকশিত হওয়ার আগেই ধ্বংস করে দেবে?এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে আমরা আইনটিকে কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছি তার ওপর। আমাদের দেশের জন্য এআই আইনটি কোনো দমনমূলক অস্ত্র হওয়া উচিত নয় যা মেধা ও উদ্ভাবনকে ধ্বংস করবে, বরং এটি হওয়া উচিত একটি রক্ষাকবচ যা মানুষের মর্যাদা আর অধিকারকে সুরক্ষিত রাখবে। এই আইনটি যদি প্রযুক্তিবিদ, আইনি বিশেষজ্ঞ এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে তৈরি করা হয়, তবে তা সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে। দেশের তরুণ সমাজ কোনো নিয়মকানুনহীন ডিজিটাল অরাজকতা চায় না, তারা চায় একটি সুশৃঙ্খল পরিবেশ যেখানে তাদের নিজেদের মেধা, সম্পদ এবং ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত থাকবে এবং তারা নিরাপদে নতুন নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে পারবে। আমাদের মূলত নিয়ন্ত্রণ করতে হবে প্রযুক্তির অপপ্রয়োগকে, এর বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে নয়।এই আইনি সংস্কার কেবল কোনো দাপ্তরিক কাজ নয়, এটি আমাদের একটি সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব। ডিজিটাল যুগে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে, মানুষের কল্যাণের জন্য প্রযুক্তির সৃষ্টি হয়েছে, প্রযুক্তির জন্য মানুষ নয়। আমরা যখন এক অজানা ডিজিটাল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, তখন আমাদের নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শিতা এবং মানবিক সহানুভূতি উভয়ই বজায় রাখতে হবে। এমন একটি আইনি পরিবেশ তৈরি করতে হবে যা আধুনিক ভবিষ্যৎকে স্বাগত জানাবে, আবার সমাজের দুর্বল ও সাধারণ মানুষের সুরক্ষাও নিশ্চিত করবে। প্রযুক্তির অসীম শক্তির সঙ্গে যদি আমরা আমাদের সাংবিধানিক ন্যায়বিচারের সঠিক সমন্বয় ঘটাতে পারি, তবে বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবে এবং এটি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে যে, আগামী দিনের প্রযুক্তি মানুষের প্রভু নয়, বরং আজীবন সেবক হিসেবেই থাকবে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল